মূল্যায়ন প্রতিবেদন
সুপারিশ আর মৌখিক নির্দেশে মিলছে শাহজালাল বিমানবন্দরের পাস!
- দর্শনার্থী প্রবেশে নেই একক নীতিমালা, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
- পাঁচ দিনে ৮০ অস্থায়ী পাস, এক বাহিনীর সবচেয়ে বেশি সুপারিশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অন্যতম সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। যেখানে নিত্যদিনই আনাগোনা হাজারো যাত্রীসহ শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীর। মৌখিক নির্দেশ আর ব্যক্তিগত সুপারিশেই মিলছে এই বিমানবন্দরে ঢোকার অস্থায়ী পাস। নেই কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। এতে দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরের নিরাপত্তাবলয় নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই চিত্র।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দর্শনার্থীদের জন্য অস্থায়ী পাস ইস্যুর ক্ষেত্রে এখনো নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ব্যবস্থা; কিংবা অভিন্ন নীতিমালা। অনেক ক্ষেত্রে মৌখিক নির্দেশ, ব্যক্তিগত রেফারেন্স কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সুপারিশেই বিমানবন্দরে ঢোকার দেওয়া হচ্ছে অনুমতি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরের জন্য এমন ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। তারা বলছেন, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ধরনের পদ্ধতি তৈরি করতে পারে নিরাপত্তাঝুঁকি। কারণ এতে আবেদনকারীর তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
সিভিল অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদ উল আলম আগামীর সময়কে বললেন, ‘এয়ারপোর্টের মতো কেপিআই সংস্থার নিরাপত্তার বিষয়টি সবসময়ই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া উচিত সরকারের। এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা এবং সেবার ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের হওয়া এখন সময়ের দাবি। কোনো কিছু বিবেচনা না করে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরের পাস ইস্যু করা নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাকেও ইঙ্গিত করে।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি মাত্র পাঁচ দিনে ইস্যু করা হয় ৮০টি দর্শনার্থী পাস। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেফারেন্স (সুপারিশ) এসেছে একটি বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।
পাঁচ দিনে ইস্যু হওয়া ৮০টি পাসের মধ্যে একটি বাহিনীর রেফারেন্সে ৩৪টি, শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ (এভসেক ও ডিএসওসহ) ১৪টি, বেবিচক সদর দপ্তর ১১টি, সচিবালয় চারটি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চারটি, অন্য একটি নিরাপত্তা বাহিনী তিনটি, বিদেশি দূতাবাস দুটি, পুলিশ দুটি, বেসরকারি ব্যাংক দুটি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রেফারেন্সে বাকি পাসগুলো ইস্যু করা হয়েছে। এমন চিত্র প্রায় সবসময়ের।
এক কর্মকর্তা জানালেন, একই ধরনের আবেদন হলেও সব সংস্থা সমানভাবে সুবিধা পায় না। কিছু সংস্থার আবেদন দ্রুত অনুমোদন হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে আরোপ করা হয় নানা শর্ত।
যদিও দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার দাবি, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর নিরাপত্তা পাস ইস্যুতে হয়নি কোনো অনিয়ম। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর মো. আসিফ ইকবাল আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি আসার পর এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রমাণসহ দিন, আমি ব্যবস্থা নিব। এয়ারপোর্টের স্থায়ী পাস আমি ইস্যু করি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘অস্থায়ী পাস বিমানবন্দরের ম্যানেজার ইস্যু করে। মাঝেমধ্যেই দেখা যায় এয়ারপোর্টের অভ্যন্তরে কোনো কাজ, তখন ঠিকাদারের শ্রমিককে ভেতরে ঢুকতে দিতে হয়। তারপরও সেগুলোর অনলাইন ফরম পূরণ অবশ্যই বাধ্যতামূলক।’
প্রতিবেদন বলছে, বর্তমান ব্যবস্থায় চেয়ারম্যান, সদস্য (নিরাপত্তা), পরিচালক (এভসেক), নির্বাহী পরিচালকসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনে দর্শনার্থীদের জন্য দেওয়া যায় অস্থায়ী পাস। অনেক ক্ষেত্রে লিখিত আবেদন ছাড়াও মৌখিক নির্দেশে পাস ইস্যুর সুযোগ রয়েছে।
এক বিমানবন্দরে ১৪০ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে ১৪০টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন। স্থায়ী নিরাপত্তা পরিচয়পত্র ছাড়াও অনেককে বিভিন্ন সময় অস্থায়ী পাস নিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। ২০২৪ সালে এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন ১ কোটি ২৪ লাখ ৮৭ হাজারের বেশি যাত্রী। বর্তমানে ৪২টি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় এয়ারলাইনস এখান থেকে পরিচালনা করছে ফ্লাইট।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা যত বেশি স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে, নিরাপত্তাও হবে তত শক্তিশালী।
বৈষম্যের অভিযোগ: অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দাবি করা হয়েছে, কিছু সংস্থার রেফারেন্সকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ দেখিয়ে পাস দিতে অনীহা দেখা যায়। এতে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক সমন্বয়েও প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তাঝুঁকির শঙ্কা: প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মৌখিক নির্দেশে পাস ইস্যুর সুযোগ থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি বা অসৎ উদ্দেশ্যের কেউ যদি পরিচয় গোপন করে প্রবেশের সুযোগ পায়, তাহলে কেপিআইভুক্ত এই স্থাপনার নিরাপত্তা পড়তে পারে হুমকির মুখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে তা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা মূল্যায়নেও ফেলতে পারে প্রভাব।
গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, দর্শনার্থী পাস পুরোপুরি অনলাইনে দেওয়া। একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সব পাস ইস্যু। আবেদনকারী ও সুপারিশকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নাম্বার ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ। পাস ইস্যুর জন্য স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন। সব সংস্থার জন্য নির্ধারিত কোটা নির্ধারণ। প্রতি মাসে ইস্যু হওয়া পাসের তথ্য প্রকাশ। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে নিয়মিত সমন্বয় সভা আয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইকাও অডিটের আগে বাংলাদেশ বিমানের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যালোচনা করা উচিত। কারণ শুধু স্ক্যানার বা সিসিটিভি নয়, বিমানবন্দরের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও অডিটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দর্শনার্থী পাস ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক করা সময়ের দাবি।



