আজ বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
সাদাছড়ি আছে চলার পথ েনই

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. তাফসীরুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্বে পড়ছেন। পাশাপাশি একটি চাকরিও করছেন। চলাচল সহজ করতে ১৫ বছর ধরে সাদাছড়ি ব্যবহার করছেন। কিন্তু খোলা ম্যানহোল, ভাঙা বা কাটা ফুটপাত, ফুটপাতে মোটরসাইকেল চলা বন্ধ করার প্রতিবন্ধকতাসহ নানা কারণে সাদাছড়ির সুফল পান না তাফসীরুল্লাহ। এমনকি অনেকবার ছোটখাটো দুর্ঘটনারও শিকার হয়েছেন।
বেসরকারি চাকরিজীবী ফিরোজা খানমও ২০১৪ সাল থেকে সাদাছড়ি ব্যবহার করেন। সব জায়গায় জেব্রা ক্রসিং না থাকায় এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে রাস্তা পার হতে সবসময় অন্যের সাহায্য দরকার হয়। একবার সাহায্য করার সময় ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন হারিয়েছেন। কয়েকবার অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের শিকার হয়েছেন। রাস্তা পার হওয়ার সময় একবার ধানমন্ডিতে এক রিকশাচালক যৌন হয়রানি করেন।
তাফসীরুল্লাহ বা ফিরোজা নয়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী অনেকেই সাদাছড়ি ব্যবহার করেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। তারা বলছেন, চোখে না দেখার কারণে অন্যদের তুলনায় চলাফেরা করতে গিয়ে তাদের বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। ফুটপাত-রাস্তাঘাট দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীবান্ধব না হওয়ায় সে সমস্যা আরও প্রকট হয়। প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনার পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়তে হয়। অনেক সময় জীবনহানি পর্যন্ত ঘটে। তবুও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সমস্যা রাষ্ট্র তেমন আমলে নেয় না। আবার অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ‘মানুষ কী ভাববে’ চিন্তা করে সাদাছড়ি ব্যবহার করতে চান না।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বলছেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে হাতে সাদাছড়ি নিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটলে চলাফেরা তুলনামূলক সহজ হয়। কিন্তু পথের দিকনির্দেশনা দিতে ফুটপাতে বসানো বিশেষ টাইলসের ওপরই কোথাও বসানো হয়েছে মোটরসাইকেল আটকানোর লোহার স্টিক, কোথাও রয়েছে ম্যানহোলের ঢাকনা, আবার কোথাও টাইলস ভাঙা বা পথ বন্ধ। ফলে নিরাপদে চলাচলের সহায়ক অবকাঠামোই হয়ে উঠছে বিপদের কারণ। এ ছাড়া ফুটপাতে দোকান, দোকান বসানোর খুঁটিতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
দেশব্যাপী প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে একটি জরিপ চালানো হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে এই প্রকল্পটি চলমান। এই হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৪ ব্যক্তিকে প্রতিবন্ধী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ২৮ হাজার ৮৩২ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮৪৭, নারী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৪৭ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ১৩৮ জন।
২০১৭ সালের ৭ মার্চ রাজধানীর পল্টনে ঢাকা ওয়াসার খোলা ম্যানহোলে পড়ে শানু মিয়া নামে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি মারা যান। দক্ষিণ কমলাপুর নিবাসী এই শানুর বয়স ছিল ৫০ বছর। আবার ২০২২ সালে চোখের হাসপাতালে যাওয়ার পথে ছয় বছর বয়সী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক শিশু ম্যানহোলে পড়ে আহত হয়। এ সময় বাবা সঙ্গে থাকায় প্রাণে বেঁচে যায় শিশুটি।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মো. তাফসীরুল্লাহ বলছেন, “পথচলার সমস্যা নিয়ে কথা বলতে বলতে ‘কোনো লাভ হবে না’ ভেবে একসময় আমরা চুপ হয়ে যাই। সমস্যাগুলোকে স্বাভাবিক ভেবে অনেকেই নিজেদের গুটিয়ে নেন। বাইরে চলাচল করতে চান না। যারা চলি তারাও দিনশেষে হতাশ হয়ে পড়ি।” পদচারী সেতু পার হতে বেশ ধকল পোহাতে হয় বলে জানিয়েছেন এই শিক্ষার্থী।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বলছেন, তারা নানাভাবে হয়রানি ও বৈষম্যেরও শিকার হন। সাদাছড়ি ব্যবহার করেও এর থেকে পরিত্রাণ মেলে না। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রী জানিয়েছে, রাস্তাঘাটে চলার সমস্যা তো রয়েছেই। এর পাশাপাশি সাহায্যের সময় অনেকেই শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ করে। কেউ কেউ চোখে না দেখার পরও পড়াশোনা করায় কটূক্তিও করে।
শরীফা আক্তার নামে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী জানিয়েছেন, সামাজিক বুলিংয়ের ভয়ে সাদাছড়ি ব্যবহার করেন না তিনি।
প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, শিশু অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডিজেবল্ড চাইল্ড ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক নাসরীন জাহান বলছেন, সাদাছড়ি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের প্রতীক। এর সাহায্যে সামনে থাকা বাধা, পথের পরিবর্তন কিংবা কিছু ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সাদাছড়ির ব্যবহারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের আরও সুরক্ষিত এবং ক্ষমতায়িত করে। মানুষকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের প্রতি আরও মানবিক এবং চলাচলের রাস্তা-ফুটপাত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীবান্ধব করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস পালন করা হয়। ‘দৃষ্টি যেখানে সীমিত, সম্ভাবনা সেখানে সীমাহীন’ প্রতিপাদ্যে এবার দিবসটি পালিত হবে।



