শেষ মুহূর্তে বাদ পড়ল বেকার ভাতা

পড়াশোনা শেষ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু মেধার পথ ধরে জোটেনি কাঙ্ক্ষিত চাকরি। আবেদন ফি আর যাতায়াত খরচ জোটাতেই নাভিশ্বাস তরুণদের। জীবনের চাকা কোনোমতে সচল রাখা এই তরুণদের চোখ আটকে ছিল এক টুকরো আশার আলোতে। ভাবা হয়েছিল, একটু হলেও হয়তো পাশে দাঁড়াবে রাষ্ট্র। শুরু হবে ‘বেকার ভাতা’। কিন্তু শেষ মুহূর্তে থেমে গেল সেই উদ্যোগ।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ঢেলে সাজাচ্ছে সরকার। বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে সত্যিকার অর্থেই যাতে মানুষের কল্যাণে কাজে আসে, সেই চিন্তা থেকেই এমন উদ্যোগ। ২০৩০ সাল পর্যন্ত পঞ্চবার্ষিক কৌশলপত্র তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। যার প্রাথমিক খসড়ায় রাখা হয়েছিল বেকার ভাতার প্রস্তাবটি। বলা হয়েছিল, শিক্ষাজীবন শেষে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত মিলবে আর্থিক সহায়তা। কিন্তু চূড়ান্ত খসড়ায় বাদ পড়েছে সিদ্ধান্তটি। মূল কারণ সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও অর্থসংকট।
জানা গেছে, চলমান ১২৩টি কর্মসূচি কমিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। একেবারেই নতুন করে আলোচনায় আসা ‘বেকার ভাতা’ চালুর উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল পরিকল্পনা তৈরির শুরুতেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি থেকে সরে আসছে সরকার।
পরিকল্পনাটি তৈরি করছে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। এ প্রসঙ্গে জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘পরিকল্পনা তৈরির প্রথম দিকে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে মিল রেখে অনেক কিছুই চিন্তা করা হয়েছিল। সেখানে একেবারেই নতুন উদ্যোগ হিসেবে বেকার ভাতার বিষয়টিও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি আর রাখা সম্ভব হয়নি।’
এমন সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চাইলে মঞ্জুর হোসেনের ভাষ্য, ‘তেমন কোনো কারণ নেই। তবে সরকারের সম্পদের সীমাবদ্ধতার কথাও মাথায় রাখতে হবে।’
পরিকল্পনার ধারণাপত্রে যুক্ত করা হয়েছিল বেশ কিছু নতুন বিষয়। যার মধ্যে রয়েছে বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন তহবিল গঠন, ই-স্বাস্থ্য কার্ড প্রচলন, জটিল রোগের ওষুধ স্বল্পমূল্যে দেওয়া এবং অনাথদের জন্য বিশেষ তহবিলসহ বিভিন্ন উদ্যোগ। বেকার ভাতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল, শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা কর্মসংস্থান না পাওয়া পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য (সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত) আর্থিক ভাতা পাবেন। পরে এই মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। এই ভাতা বেকারদের টিকে থাকতে সহায়তা দেবে। এতে তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
যদিও বিশেষজ্ঞরাও বর্তমান বাস্তবতায় ভাতার চেয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিকে জরুরি বলছেন। বেকার ভাতা থেকে সরে আসার বিষয়টিকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সাবেক চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, ‘দেশে লাখ লাখ বেকার রয়েছে। তাদের ভাতা দিতে গেলে অনেক টাকা দরকার। উন্নত দেশগুলো বেকার ভাতা দিতে পারে, কারণ তাদের বেকারের সংখ্যা অনেক কম। ফলে সেটি সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনা করে আমাদের দেশে সেটি কঠিন। বরং সরকারের যেটি করা উচিত সেটি হলো, দক্ষতা বৃদ্ধি করা। বেকারদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের উন্নয়ন করা। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে তুলে দেশে ও বিদেশে কাজের সুযোগ করে দিতে হবে।’
দেশের বর্তমান বেকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ ৩০ হাজার। দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন সেন্টারের (পিপিআরসি) হিসাবে দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। সব জরিপেই একটি বিষয় দেখা যায়, মোট বেকারের মধ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগছা ইউনিয়নের স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা জাহিদুল ইসলামের কথাই ধরা যাক। সরকারি চাকরির বয়স শেষ। বেসরকারি চাকরিও জোটেনি। চোখে-মুখে এখন ঘোর অনিশ্চয়তা। তিনি জানালেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন অর্থনীতিতে। সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষা দিতে দিতেই বয়স পেরিয়ে গেছে।
জাহিদুল বলছিলেন, ‘বেকার ভাতা থাকলে অনেক সুবিধা হতো। কেননা, লেখাপড়া শেষ করে যারা বেকার হয়ে যান, তাদের বিভিন্ন চাকরিতে দরখাস্ত করতেও অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। ভাতার পরিমাণ একটু সম্মানজনক হলে সেক্ষেত্রে অনেক কাজে লাগবে।’
বেকার ভাতার উদ্যোগ থেকে সরকার সরে আসায় হতাশ জাহিদুল। তিনি বললেন, ‘একজন বেকারের কাছে সামান্য টাকাও অনেক বেশি মনে হয়। সেখানে রাষ্ট্র যদি পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে টিকে থাকার শক্তি বাড়ত।’
এক প্রশ্নের জবাবে জাহিদুল বললেন, ‘প্রথম দিকে বেসরকারি চাকরিতে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সরকারি চাকরির পেছনে ছুটতে গিয়ে আজ এ অবস্থা। এখন না পারছি পারিবারিক কৃষিকাজে যুক্ত হতে, না পারছি অন্য কোনো কাজ করতে। বড় বিপদে দিন কাটছে।’






