গ্রামের অসচ্ছল পরিবারে কম দামে এলপিজি দেবে সরকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকার অসচ্ছল পরিবারে সুলভমূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সভায় এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়কে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। শিগগিরই এটি বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের এই উদ্যোগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবেশ রক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসে (আইইইএফএ) বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন শফিকুল আলম। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, এটা খবুই ভালো উদ্যোগ। প্রতিবেশী ভারতেও এমন সুবিধা দেওয়া হয় এবং এটি সেখানে বেশ কার্যকর। কিন্তু গ্রামের অসচ্ছল মানুষের পাশাপাশি ঢাকা ও অন্যান্য শহরে বস্তিতে বসবাস করা অনেক দরিদ্র মানুষ রয়েছেন। তাদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা দরকার।
এই উদ্যোগ সফল করতে তার পরামর্শ হলো সবার আগে প্রকৃত অসচ্ছল পরিবারগুলো নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে স্বচ্ছ ডাটাবেজ তৈরি করা। একই সঙ্গে ভর্তুকি মূল্যের এই সিলিন্ডারগুলো যাতে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা কোনো চায়ের দোকানে পাচার না হয় তা নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের একটি বিশাল অংশ রান্নার কাজে প্রথাগত কাঠ, খড়কুটো কিংবা ঘুঁটের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে একদিকে যেমন নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে চুলার ক্ষতিকর ধোঁয়া গ্রামীণ নারী ও শিশুদের ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করছে।
অবশ্য গ্রামের সচ্ছল মানুষদের কেউ কেউ এখন এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। কিন্তু আকাশছোঁয়া দামের কারণে তারা তা নিয়মিত ব্যবহার করতে পারছেন না।
মূলত বাসাবাড়িতে রান্নায়, কারখানা, বাণিজ্যিক ও গাড়ির জ্বালানি হিসেবে (অটো গ্যাস) ব্যবহার হচ্ছে এলপিজি। গত ৭ বছরে দেশে এলপিজির ব্যবহার দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ১৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে। এলপিজির ৮০ শতাংশই ব্যবহার হয় বাসাবাড়িতে। বর্তমানে এই জ্বালানির গড় মাসিক বাজার ১ লাখ ৩০ হাজার টন।
দেশে সরবরাহ করা এলপিজির ৯৮ শতাংশই আসছে বেসরকারিভাবে। মাত্র ২ শতাংশ এলপিজি সরকারিভাবে সরবরাহ হচ্ছে। কিন্তু সরকারি এ এলপিজি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। বর্তমানে সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা। দীর্ঘদিন ধরেই এ দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা এলপিজির দাম দ্বিগুণ থেকে কখনো কখনো আরও বেশি হয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে সেই দামে কখনোই পাওয়া যায়। নানা অজুহাতে খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছামতো বাড়তি দাম আদায় করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জ্বালানি সংকট সমাধানে নানা ধরনের মডেল ও বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। দরিদ্র পরিবারে সুলভমূল্যে বা বিনামূল্যে এলপিজি সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সফল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। দেশটিতে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা বহু পরিবারকে বিনামূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার ও রেগুলেটর সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ভারতের এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সরাসরি ব্যাংকে ভর্তুকি দেওয়া। সেখানে গ্রাহকরা বাজারমূল্যেই সিলিন্ডার কেনেন, কিন্তু সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তুকির টাকা সরাসরি দরিদ্র সুবিধাভোগীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয়। যার ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দুর্নীতি বা কালোবাজারির সুযোগ থাকে না।
অন্যদিকে, পাকিস্তানে শীতকালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসচ্ছল পরিবারের জন্য মাঝে মাঝে কোটা বা কম দামে সিলিন্ডার সরবরাহের অস্থায়ী ঘোষণা দেওয়া হয়।






