নতুন রাষ্ট্রপতি কি নতুন ক্ষমতা পাবেন
- ২০ আগস্ট নির্বাচন করা হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি
- রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন সংবিধান সংশোধন
- পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে লাগবে দেড় থেকে দুই বছর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্য আনার বিষয়ে বিএনপিসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সেই বাড়তি ক্ষমতা না পেলেও পেতে পারেন নিজের মেয়াদের মধ্যেই।
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। নতুন রাষ্ট্রপতিকে আরও ক্ষমতাবান করার রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকলেও সে ক্ষমতা কার্যকর হতে এখনো অপেক্ষা করতে হবে অনেকটা সময়। কারণ রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার বাড়াতে হলে আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে দেড় থেকে দুই বছর লেগে যেতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে মোট চারটি প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের সব কটিতেই একমত হয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি, সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের নির্বাচনী জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। যদিও কয়েকটি বিষয়ে কিছু দল ভিন্নমত ও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাষ্ট্রপতির নিয়োগক্ষমতা বাড়ানো। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে রাষ্ট্রপতিকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার সরাসরি ক্ষমতা দেওয়া হবে।
ফলে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই রাষ্ট্রপতি নিজ এখতিয়ারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, তথ্য কমিশনের প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনার, প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন।
একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতিকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এই দুই প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের বিষয়ে বিএনপিসহ নয়টি রাজনৈতিক দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ক্ষমা করার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় পরিবর্তন আনার প্রস্তাব রয়েছে। ৩০টি দল এ বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির ক্ষমার এখতিয়ার আইনে নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। কোনো আবেদন বিবেচনার আগে মামলার বাদী অথবা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের সম্মতি নেওয়ার বিধানও রাখার কথা বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হলেও বাস্তবায়নের জায়গায় এসে দেখা দিয়েছে সময়ের প্রশ্ন। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটি এখনো কাজের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কমিটির সদস্য ও বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন, কমিটি এখন পর্যন্ত মাত্র একটি বৈঠক করেছে। সেখানে প্রাথমিক কিছু আলোচনা হলেও কোন কোন বিষয়ে সংবিধান সংশোধন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মতে, সংবিধান সংশোধন একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে অতীতের অষ্টম সংশোধনী মামলার রায়সহ সাংবিধানিক বিভিন্ন নির্দেশনা বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো সংশোধনীই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। ফলে সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করেই এগোতে হবে।
কত সময় লাগবে, এ প্রশ্নেরও নির্দিষ্ট উত্তর নেই জয়নুল আবেদীনের কাছে। তার ভাষ্য, কতগুলো বৈঠক হবে, কী কী বিষয় আলোচনায় আসবে এবং শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে— তার ওপরই নির্ভর করবে পুরো প্রক্রিয়ার সময়কাল।
বিশেষ কমিটির আরেক সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থও একই বাস্তবতার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার বাড়ানো হবে কি না, সেটি সংবিধান সংশোধনের এজেন্ডা চূড়ান্ত হওয়ার পরই বলা সম্ভব।
বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এমনিতেই বেশ সীমিত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেই তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ক্ষমা করার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ এখতিয়ার অবশ্য রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রেও সাংবিধানিক কাঠামো ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগে তার ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কারের লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। পরে এসব কমিশনের সুপারিশ বিবেচনা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির জন্য গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৭২টি বৈঠক শেষে কিছু ভিন্নমতসহ মোট ৮৪টি সুপারিশ ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ স্থান পায়।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার প্রস্তাবও সেই ঐকমত্যেরই অংশ। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করছেন, রাষ্ট্রপতিকে আরও ক্ষমতাবান করার প্রস্তাব জুলাই জাতীয় সনদে ছিল এবং গণভোটেও তা অনুমোদিত হয়েছে। তার মতে, গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবে বাস্তবায়নের পথে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া। বদিউল আলম মজুমদারের ভাষ্য, বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। দলটি সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে।
ফলে রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হলেও সাংবিধানিক বাস্তবতায় তার প্রতিফলন ঘটতে সময় লাগবে। ২০ আগস্ট যিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, তার হাতে তাই আপাতত নতুন কোনো ক্ষমতা যোগ হচ্ছে না। সংবিধান সংশোধনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই পরিবর্তন কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদটি থাকছে আগের মতোই— রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলেও বাস্তব নির্বাহী ক্ষমতায় অনেকটাই আলংকারিক।




