থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক পরামর্শ সভা

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে চতুর্থ পররাষ্ট্র বিষয়ক পরামর্শ সভা (এফওসি) আজ থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং থাই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব একসিরি পিনতারুচি।
এই পরামর্শ সভায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামগ্রিক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মী অভিবাসন, জ্বালানি, কৃষি, সাংস্কৃতিক বিনিময়, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা।
চলমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে দুটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করে: বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানি করা এবং থাই বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সেগুলোর ওপর শুল্ক কমানো। থাই পক্ষ প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করার এবং উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করে। এ ছাড়া, থাই প্রতিনিধি দল দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা দ্রুত শুরুর অনুরোধ জানায়।
যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, উভয় পক্ষই ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম ও রানোং বন্দরের মধ্যে প্রথম সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরুর বিষয়টিকে স্বাগত জানায়। এর ফলে পরিবহনের সময় প্রায় ১৫ দিন থেকে কমে মাত্র ৪ দিনে নেমে আসবে, যা লজিস্টিক ব্যয় কমিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ত্বরান্বিত করবে।
বাংলাদেশ থাইল্যান্ডের কাছে বাংলাদেশি ফল ও শাকসবজি প্রক্রিয়াজাতকরণে কারিগরি সহযোগিতা ও বিনিয়োগের আহ্বান জানায়। পাশাপাশি, বৈশ্বিক হালাল খাদ্য বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুরোধও জানানো হয়।
‘থাই ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি’ (টিকা) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ আতিথেয়তা, নার্সিং, জার্মপ্লাজম এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের অনুরোধ জানায়। থাইল্যান্ড তাদের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপরও জোর দেয়।
উভয় পক্ষ চাল আমদানি ও কর্মী অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়সহ আলোচনার পর্যায়ে থাকা বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে সম্মত হয়।
উভয় পক্ষই চলমান জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে। ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করে, বাংলাদেশ কৃষি অবশিষ্টাংশ ও কৃষি-শিল্প বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করে। আগামী বছর বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫৫তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রেক্ষাপটে, উভয় পক্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে পারস্পরিক বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তারা আশা প্রকাশ করেছে যে, আগামী বছর উভয় দেশের সরকারপ্রধানদের সফর এই বার্ষিকী উদযাপনের একটি বিশেষ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
উভয় দেশ সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া বিনিময় প্রসারে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে একমত হয়েছে। এর অংশ হিসেবে, বাংলাদেশ ক্রিকেট ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক দক্ষতা বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছে, অন্যদিকে থাইল্যান্ড তায়েকোন্দো প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে।
আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে, বাংলাদেশ ‘আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ‘রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’ (আরসিইপি)-এ যোগদানের বিষয়ে থাইল্যান্ডের অব্যাহত সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল মিয়ানমারের রাখাইনে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিষয়ে থাইল্যান্ডের সমর্থন চেয়েছে। উভয় পক্ষই মানব পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, অনলাইন জালিয়াতি এবং মাদক ব্যবসার মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ক্রমবর্ধমান হুমকির বিষয়টি স্বীকার করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, তারা যৌথভাবে কাজ করতে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি যৌথ কমিটি গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করতে সম্মত হয়েছে।
দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে বৈঠকটি শেষ হয়েছে।



