সংকটের কথা শুনলেন না, শুধু ধন্যবাদই দিলেন তিতাস কর্মকর্তা
- ‘দিনে ১ ঘণ্টাও গ্যাস থাকে না’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পদে তিনি মহাব্যবস্থাপক। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের। সত্যজিৎ ঘোষ নামের এই কর্মকর্তার দায়িত্ব প্রিপেইড মিটার ডিভিশনে।
গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৬ মিনিটে ‘দিনে ১ ঘণ্টাও গ্যাস থাকে না’ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ফোন করা মাত্রই রূঢ় স্বরে জবাব, ‘ঠিক আছে ধন্যবাদ। আমি মিটিংয়ে।’
আবারও বিনয়ের সঙ্গে প্রতিবেদক জানতে চান, গ্যাস না থাকার বিষয়টি অবগত আছেন কি না। সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘জনসংযোগে ফোন করুন। অফিসে আসেন। তথ্য দেওয়া হবে। ধন্যবাদ, আমি মিটিংয়ে আছি। আমাদের জনবল কাজ করছে। শিগগির সমস্যার সমাধান হবে।’
কতদিনে এ সংকটের সমাধান হবে— পাল্টা প্রশ্ন প্রতিবেদকের। অফিসে গেলে কি আগামীকাল এ বিষয়ে একটু সময় দেবেন? সম্পূরক প্রশ্নে আরও রেগে গেলেন প্রকৌশলী সত্যজিৎ ঘোষ, ‘আমি কি মিটিংটিটিং বাদ দিয়ে দেব আপনার জন্য? আবারও ‘ধন্যবাদ’ দিলেন।
১ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের কথপোকথনের মধ্যে আরও দু-একবার বেসুর গলায় ধন্যবাদ বলেছেন এই কর্মকর্তা। তবে গ্যাসের সংকট নিয়ে তার যে মাথাব্যথা নেই— এটা স্পষ্ট হলো! এই হচ্ছে সেবা খাতের সেবা দেওয়ার অবস্থা।
রোকসানা পারভীন। থাকেন মিরপুর ১২-এর পল্লবীর ধ-ব্লকে। পেশায় গৃহিণী। জানালেন, ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ঘণ্টাখানেক গ্যাস থাকে। তাও আবার কখন থাকবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। বেশিরভাগ সময় থাকে রাত ১২টার পর। এই গৃহিণী বাধ্য হয়ে ইন্ডাকশন চুলা কিনেছেন। এর সঙ্গে আলাদা হাঁড়ি-পাতিলও। এতে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিল। সঙ্গে জোগাতে হচ্ছে গ্যাসের মিটার ভাড়াও। ক্ষোভ প্রকাশ করে রোকসানা পারভীন বলেছেন, ‘১০ শতাংশ সময়ও গ্যাস থাকে না। সকাল ৭টায় রান্না করব— গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হয়। গভীর রাতে গ্যাস এলেও কাজে আসে না। পিক টাইমে কখনোই গ্যাস থাকে না।’
প্রিপেইড মিটার এই গৃহিণীর। প্রতি মাসে মিটার ভাড়া ২০০ টাকা। যে টাকা মিটার ভাড়া, সেই টাকার গ্যাসও ব্যবহার করতে পারেন না তিনি। উল্টো বিদ্যুৎ বিল প্রায় হাজার টাকা বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার কারণে। আগে গরমের সময় বিদ্যুৎ বিল আসত ২ হাজার ৫০০ টাকার মতো। বৈদ্যুতিক চুলা কেনার পর তা প্রায় সাড়ে তিন হাজারে দাঁড়িয়েছে। আগামীর সময়কে রোকসানা পারভীন বলেছেন, গ্যাস এলেও চাপ কম থাকে। রান্না হওয়ার মতো গ্যাসের চাপ থাকে না। ফলে ইন্ডাকশন চুলাই ব্যবহার করতে হয়।
পল্লবীর অধিকাংশ বাসার একই অবস্থা। প্রায় প্রতিটি বাসায় গ্যাসের চুলার পাশে দেখা মেলে আরেকটি বৈদ্যুতিক চুলার। কেউ কেউ রাইস কুকারও কিনেছেন। বাদ যায়নি গ্যাস সিলিন্ডার কেনাও। তবে এতেও রয়েছে বিপত্তি। রাতে সিলিন্ডার শেষ হলে ভরসা করতে হয় সেই বৈদ্যুতিক চুলাতেই। ফলে রান্নার জ্বালানির রাখতে হচ্ছে একাধিক বিকল্প।
উত্তর পল্লবী এলাকায়ও গ্যাসের চরম সংকট। আজিজুর রহমান খান মিথুন নামে এক স্থানীয় ব্যবসায়ী আগামীর সময়কে বলেছেন, তিতাসে অভিযোগ দিয়েছি বহুবার। তাদের এক কথা, ‘আমাদের অনেক জনবল কাজ করছে। শিগগির সমস্যার সমাধান হবে।’ শুরুতেই প্রকৌশলী সত্যজিৎ ঘোষ যেভাবে বলেছিলেন। তার অধস্তনদেরও সেই অমৃত বাণীতেই আস্থা!
পল্লবীর একাধিক পরিবার জানিয়েছে, যত টাকার গ্যাস রিচার্জ করা হয়, তার চেয়ে মিটার ভাড়াই বেশি দিতে হয়। ৫০০ টাকার গ্যাস রিচার্জ করলে তা শেষ হতে হতে লেগে যায় চার-পাঁচ মাস। অথচ হাজার টাকা মিটার ভাড়া দিতে হয়। কখনো কখনো ৫ মাসেও ৫০০ টাকার গ্যাস শেষ হয় না। এক বছর ধরে এ অবস্থা চলছে। আগে সকাল ৭টা পর্যন্ত গ্যাস থাকত পল্লবী এলাকায়। আবার দুপুর ২টার পর আসত। তবে এখন দিনের যেকোনো সময় ঘণ্টাখানেকের জন্য গ্যাস থাকে। এই এলাকার পোস্টপেইড গ্যাস ব্যবহারকারীদের অবস্থা আরও খারাপ। প্রতি মাসে ২ চুলা বাবদ ১ হাজার ৮০ টাকা দিতে হয়। অথচ গ্যাস পান ১০০ থেকে ২০০ টাকার।
গ্যাসের সংকট মানিকনগরেও। এই এলাকার ওয়াসা রোডে থাকেন সেলিনা আক্তার। চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। সারা বছর গ্যাসের সংকটে ভুগতে হয় তাকে। পোস্টপেইড মিটার সেলিনা আক্তারের। রাত ৩টার পর গ্যাস আসে। আবার চলে যায় ভোর ৬টার পরপরই। ফলে রাত ৪টার দিকে উঠে রান্না করে রাখতে হয় তাকে। বিকাল ৩-৪টার দিকে গ্যাস এলেও তখন অফিসে থাকেন। সেই গ্যাস চলে যায় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে। ফলে তা কাজে আসে না। বর্তমানে সিলিন্ডারে রান্না করেন এই নারী। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় বর্তমান সংসদ সদস্য কথা দিয়েছিলেন, গ্যাস সমস্যার সমাধান হবে। তবে সংকট এখনো আছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর কিছু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ওয়াসা রোডের প্রায় সব বাড়ির মালিকের কাছ থেকে ২০ থেকে ৫০ হাজার করে টাকা নিয়েছেন তিতাস থেকে বড় পাইপে এনে গ্যাসের সমস্যা সমাধানের কথা বলে। তবে তাতে শুধু টাকাই গচ্চা গেছে, সমস্যার সমাধান হয়নি। বর্তমানে এ এলাকার প্রিপেইড এবং পোস্টপেইড গ্যাস ব্যবহারকারীরা কিনছেন সিলিন্ডার।
সেবা খাতের এ বৈষম্য কতদিন চলবে জানতে চাওয়া হয়েছিল নগরবিদ আদিল মুহাম্মদ খানের কাছে। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, এ চিত্র বদলাবে না। গ্যাস নিয়ে পুরো শহরে একটা নৈরাজ্য চলছে। একই শহর, কোথাও সংকট আছে— আবার কোথাও নেই। কেন এমন হবে? গ্যাস না দিতে পারলে মিটার চার্জ বাতিল করা উচিত বলে মনে করেন এই নগরবিদ। নগরের কোথাও গ্যাসের লাইনে কাজ করলে বা সংকট থাকলে নগরবাসীকে সেটা আগেই জানাতে হবে। আবার গ্যাস না দিতে পারলে বা দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস দিলে, সেই অনুযায়ী মিটার ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে বলে যুক্ত করেন তিনি।






