আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিচার হবে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ফাইল ছবি
দেশের মাটিতে সংঘটিত প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রাক্কালে নিজের গুম হওয়ার ঘটনা স্মৃতিচারণ করে গতকাল শনিবার রাতে এমনই আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই মন্ত্রী।
গুম হওয়া সেই রাতের কথা স্মরণ হলে এখনো শরীরে শিহরণ জাগে বলে জানান ২০১৫ সালে গুম হওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ।
নিজের গুমদশার স্মৃতিচারণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছিলেন, ‘১১ বছর আগের ঘটনা… স্মৃতিতে এখনো জ্বল জ্বল করে। এখনো স্মরণে আসলে শরীরে শিহরণ জাগায়।’
‘চোখ বাঁধা কালো কাপড়ে, হাত বাঁধা স্টিলের হ্যান্ডকাফে। এক নয়, দুই নয়, দশ নয়, টানা ৩২ ঘন্টা এভাবে কেটেছে আমার। সেই স্মৃতি এখনো আমাকে কষ্ট দেয়, মনের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়’, বক্তব্যে যোগ করেন মন্ত্রী।
আজ রবিবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। বাংলাদেশ এই দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করছে।
২০১৫ সালের ১০ মার্চ উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যায়। এরপর তাকে আইনের হাতে সোপর্দ না করে গুম করে রাখা হয়।
দুই মাসেরও বেশি সময় পর পরিবারের সদস্যরা খবর পান সালাহউদ্দিন আহমদ ভারতের শিলংয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এর আগে অজ্ঞাত ‘আয়নাঘরে’ ৬১ দিন বন্দি ছিলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, উত্তরার একটি বাসা থেকে আমাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে সাদা পোষাকে অস্ত্রধারীরা তুলে নিয়ে যায়… কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে ফেলে, হাতে বেঁধে ফেলে। তারপরের ঘটনাগুলো আরও ভয়ংকর।
‘আমাকে রেখেছিল পাঁচ ফিটের একটি কুঠরিতে… ৬১ দিন। এই ৬১টি দিন কখন রাত কখন দিন— কিছুই আমি জানতে পারিনি। ওখানে খাবার দেওয়ার জন্য একটি জায়গা ছিল দরজার নিচে… বাইরে ফ্যান ছিল, আওয়াজ হতো। আমাকে কখনো ওখান থেকে বের করেনি, কেবল রুম পরিষ্কারের জন্য বের করেছিল দরজার বাইরে। প্রতি মুহূর্তে আমি মৃত্যুর জন্য প্রহর গুনছিলাম’, অজ্ঞাত ‘আয়নাঘরে’ বন্দিদশার বর্ণনা দিচ্ছিলেন মন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এখন যে আয়নাঘরের বর্ণনা গণমাধ্যমে বেরিয়ে আসছে, আমরা সেই বন্দিজীবন তার চেয়ে কঠিন অবস্থার… বর্ণনা করলে শরীরে যেন একরকম কাপুনি ধরে।
২০১৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরে সীমান্তের ওপারে ফেলে আসলে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলায় শিলংয়ে বন্দিত্বের জীবন কাটাতে হয়েছে সালাহউদ্দিন আহমদকে। দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়ায় ছাড়াও পান তিনি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই দেশে ফিরতে পারেননি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে ১১ আগস্ট দেশে ফেরেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছিলেন, যে দিন আমাকে আয়নাঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল, সেদিন দীর্ঘ একটা যাত্রা। চোখ বেধে, হাত বেধে… তারপর শিলংয়ের একটি জায়গায়, এটাকে গলফ মাঠ বলা হয়। সেখানে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলা হয়, ‘ইউ আর ফ্রি নাউ’।
‘দীর্ঘ ৯ বছর তিন মাস বা চার মাস হলো যখন আইনিভাবে দেশে ফেরার চেষ্টা করছিলাম, তখন ভারত সরকার আবার আমার খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করে। সেই আপিল আদালত খালাস করার পর সরকারকে নির্দেশনা দিল যে এই লোককে তার দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় পাঠান’, জানান মন্ত্রী।
সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, ‘আমার সহকর্মীদের মধ্যে, রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে, এমনকি সাংবাদিকরাও এই গুমের শিকার হয়েছেন। তারা অনেকেই আমার মতো সৌভাগ্যবান হননি যে বেঁচে আছেন বা তাদের খুঁজে পাওয়া গেছে। সেই দিক থেকে আমি অনেক সৌভাগ্যবান। মহান আল্লার দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী বক্তব্য, ‘আমি নিশ্চিত করে বলতে চাই, এই দেশের মাটিতে ইনশাআল্লাহ, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিচার হবে। আয়নাঘরের বন্দিশালা তৈরি করে যারা ভিন্নমতকে দমনের কুশীলব তাদের রেহাই নেই। অবশ্যই অবশ্যই তাদের আদালতের মাধ্যমে বিচার করা হবে।’







