হামে মৃত্যু বেশি দরিদ্রদের
গরিবের মৃত্যুর কান্না পৌঁছায় না ওপরতলায়
- ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু
- এখন পর্যন্ত প্রাণ গেল ৭৬৬ শিশুর
- স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার মৃত্যুর অন্যতম কারণ

মাত্র পাঁচ মাস বয়সী শামসুলকে বাঁচাতে ৬০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন বাবা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইসিইউর বিছানায় থেমে যায় শিশুটির নিঃশ্বাস। শামসুল একা নয়; এ বছরের হামে মারা যাওয়া শত শত শিশুর গল্প প্রায় একই। অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান, যাদের শরীর আগে থেকেই অপুষ্টিতে জর্জরিত। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, হামে শুধু ভাইরাস নয়, দারিদ্র্য ও অপুষ্টিও শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর দরিদ্র শিশুদের মৃত্যুর কারণে সরকারেরও এদিকে নজর কম।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের মতে, দেশে এখনো হামের ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কিন্তু সরকার এখনো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেনি।
মুশতাক হোসেনের ভাষায়, ‘যেসব শিশু মারা যাচ্ছে, তাদের বড় অংশই দরিদ্র পরিবারের। তারা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে না। ফলে সরকারিভাবে পদক্ষেপ ও আলোচনা— দুটিই প্রয়োজনের তুলনায় কম।’
চলতি বছরের মার্চে দেশে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাব এখনো থামেনি। প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে এ বছর এখন পর্যন্ত ৭৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার মানুষ। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন আক্রান্ত হয়েছে ৯৯০ জন। মার্চ থেকে সংক্রমণের এই উচ্চ প্রবণতা প্রায় একইভাবে অব্যাহত রয়েছে।
পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের কান্নার গল্প। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৫৭ শিশু। তাদের সবার বয়স পাঁচ বছরের নিচে। হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মারা যাওয়া এই শিশুদের প্রায় সবাই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অনেকেই হামে আক্রান্ত হওয়ার আগেই অন্য রোগে ভুগছিল।
পটুয়াখালীর পাঁচ মাস বয়সী শামসুল ইসলামকে হামে আক্রান্ত হওয়ার পর ভর্তি করা হয়েছিল বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। তিন দিন পর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে। বাবা জহিরুল ইসলাম স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক। মাসিক আয় মাত্র ৭ হাজার টাকা। সন্তানের চিকিৎসার জন্য ৬০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি। একইভাবে মারা যাওয়া গাজীপুরের রিপনের বাবা একজন অটোরিকশাচালক।
হাসপাতালের তথ্য বলছে, মারা যাওয়া শিশুদের বেশিরভাগের বাবাই রিকশাচালক, অটোরিকশাচালক, দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি, সবজি বিক্রেতা কিংবা কৃষক।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে মৃত্যুর সঙ্গে দারিদ্র্য ও অপুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থাকে। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ফলে হামে আক্রান্ত হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কের জটিলতার মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সময়মতো টিকা না পাওয়া, চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়া, স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং পরিবারের অপর্যাপ্ত পরিচর্যা। এমন প্রেক্ষাপটে দরিদ্র পরিবারের শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেছেন, যেসব অভিভাবকের শিক্ষার সুযোগ কম এবং অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল, তাদের অনেকেরই পুষ্টি সম্পর্কে ধারণা সীমিত। আবার পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করার সামর্থ্যও থাকে না। ফলে এসব পরিবারের শিশুরা বেশি অপুষ্টিতে ভোগে। তার মতে, টিকা দেওয়ার পরও অপুষ্ট শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হতে বেশি সময় লাগে, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মাত্রায় তৈরি না-ও হতে পারে। এ কারণেই তাদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্যও একই চিত্র তুলে ধরছে। সংস্থাগুলোর মতে, হামে মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অপুষ্টি, কম টিকাদান কভারেজ এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা একসঙ্গে বিদ্যমান, সেখানে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে শুধু টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করলেই হবে না। একই সঙ্গে শিশুদের পুষ্টির উন্নয়ন, ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি ব্র্যাক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও হাসপাতালে গিয়ে একই বাস্তবতা দেখার কথা জানিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘অনেক হাসপাতালে হামের ওয়ার্ডে ঘুরে দেখেছি, প্রায় সব শিশুই অপুষ্টিতে ভুগছে। তাদের শরীর হাড় জিরজিরে, ওজনও খুব কম।’
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেছেন, অপুষ্টির সঙ্গে দরিদ্রতার সম্পর্ক রয়েছে এবং অপুষ্ট শিশুরাই মূলত বেশি মারা যাচ্ছে। তবে দরিদ্র পরিবারের শিশু মারা যাচ্ছে বলেই সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না— এমন অভিযোগ সঠিক নয়। তার ভাষায়, ‘এ সময়ে এত মানুষ হামে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়। যেসব শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে মারা যাচ্ছে, সেগুলো সত্যিই হাম কি না, তা গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে টিকার কোল্ড চেইন ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করলেই হবে না। পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টির উন্নয়ন, ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের সতর্কবার্তা— অন্যথায় হামের প্রকোপ কমলেও দারিদ্র্য ও অপুষ্টির কাছে শিশুদের জীবন হারানোর এই মিছিল থামবে না।





