প্রথম হাঁটাটাই যেখানে স্বপ্ন
- বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস আজ

ছবি: আগামীর সময়
একটি শিশু যখন প্রথমবার মায়ের হাত ছেড়ে দাঁড়ায়, তখন সেই দৃশ্যের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কয়েক পা এগিয়ে পড়ে গেলেও পরিবারের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু সব শিশুর বেড়ে ওঠার গল্প এক নয়। কারও কাছে নিজের পায়ে দাঁড়ানো, একটি শব্দ বলা কিংবা চামচ দিয়ে নিজে খাওয়াও হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়। সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের বেড়ে ওঠার গল্প অনেকটা এমনই। কেউ ঠিকমতো বসতে পারে না, কেউ হাঁটতে পারে না। কারও হাত-পায়ের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আবার কারও কথা বলা, খাওয়া, দেখা, শোনা কিংবা শেখার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সেরিব্রাল পালসি মানেই একটি শিশুর সব সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।
আজ ৬ অক্টোবর, বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে আক্রান্ত প্রায় ৫ কোটি মানুষের অধিকার, প্রয়োজন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সামনে রেখে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করছে। দিবসটি শুধু একটি রোগ সম্পর্কে মানুষকে জানানোর দিন নয়, বরং সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেরও একটি সুযোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর বিকাশমান মস্তিষ্কে অস্বাভাবিকতা বা ক্ষতির কারণে সেরিব্রাল পালসি হতে পারে। জন্মের আগে, জন্মের সময় কিংবা জন্মের পরপরই মস্তিষ্কে কোনো ক্ষতি হলে এর ঝুঁকি বাড়তে পারে। অপরিণত বা কম ওজন নিয়ে জন্ম, জন্মের সময় অক্সিজেনের ঘাটতি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও কিছু সংক্রমণও ঝুঁকি বাড়ায়। তবে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে সেরিব্রাল পালসির নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক ও অধ্যাপক ডা. মো. বরুল আলম বলেছেন, সেরিব্রাল পালসির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নড়াচড়া ও অঙ্গভঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা। কারও পেশি শক্ত হয়ে যায়, কারও অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া হয়, আবার কারও শরীরের ভারসাম্য ও সমন্বয় করতে সমস্যা হয়। এর প্রভাব শুধু হাঁটা বা চলাফেরায় সীমাবদ্ধ নয়; কথা বলা, গিলতে পারা, খাওয়া, দেখা, শোনা কিংবা শেখার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে।
‘বয়স বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে’— এই অপেক্ষাই বিপদ।
শিশু বয়স অনুযায়ী মাথা ধরে রাখতে পারছে না, বসতে পারছে না, হামাগুড়ি দিচ্ছে না, দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে না কিংবা একপাশের হাত-পা বেশি ব্যবহার করছে— এসব লক্ষণ দেখা গেলে পরিবারের সতর্ক হওয়া জরুরি। কিন্তু অনেক পরিবার এসবকে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের দেরি মনে করে অপেক্ষা করতে থাকে। কেউ ভাবেন, বয়স বাড়লেই শিশু ঠিক হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন অপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হতে পারে। কারণ শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর মস্তিষ্কের বিকাশ ও শেখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় থেরাপি ও সহায়তা শুরু করা গেলে শিশুর দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
সেরিব্রাল পালসির চিকিৎসা মানেই শুধু ওষুধ নয়। সব শিশুকে পুরোপুরি সুস্থ করে দেওয়ার মতো কোনো একক চিকিৎসা নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যথা ও জটিলতা কমানো এবং তাকে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর করে তোলা। এজন্য প্রয়োজন হতে পারে ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা বাড়ানোর থেরাপি, কথা বলা ও ভাষা শেখার থেরাপি, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, হুইলচেয়ারসহ বিভিন্ন সহায়ক যন্ত্র। কারও ক্ষেত্রে দৃষ্টি ও শ্রবণ পরীক্ষা কিংবা খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন হতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে হাড় ও অস্থিসন্ধির অস্ত্রোপচারও লাগতে পারে।
তবে চিকিৎসা শুরু করাই অনেক পরিবারের জন্য শেষ কথা নয়, বরং শুরু হয় আরেকটি দীর্ঘ লড়াই। বাংলাদেশে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার বড় অংশ রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক। ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পরিবারগুলোকে চিকিৎসা ও থেরাপির জন্য বারবার ঢাকায় আসতে হয়। নিয়মিত থেরাপির খরচের পাশাপাশি যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং অভিভাবকের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার ব্যয়ও যোগ হয়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য এই খরচ বহন করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শুরুতে থেরাপি চালু রাখলেও কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর অনেক পরিবার তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ এস এম মাহমুদুজ্জামান শোয়েব বলেছেন, সেরিব্রাল পালসি মূলত দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার বিষয়। কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস থেরাপি করালেই সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে— এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। শিশুর বয়স ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে থেরাপির ধরন ও লক্ষ্যও পরিবর্তিত হতে পারে। তার মতে, শুধু হাসপাতাল বা থেরাপি কেন্দ্র বাড়ালেই হবে না; পরিবারকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ঘরেও নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা বাড়ানোর থেরাপি ও কথা বলার থেরাপির সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুর যত্ন শুধু শিশুটির জীবনকেই বদলে দেয় না, বদলে দেয় পুরো পরিবারের জীবনও। রক্তিমের মা ইশরাত জাহান (ছদ্মনাম) বলেন, শিশুর খাওয়া, গোসল, পোশাক পরানো থেকে শুরু করে নিয়মিত থেরাপিতে নিয়ে যাওয়া— সবকিছুর বড় দায়িত্ব মায়ের ওপর পড়ে। সন্তানকে দেখাশোনা করতে গিয়ে তাকেও চাকরি ছাড়তে হয়েছে। তার মতো অনেক মায়ের কাছেই সন্তানের চিকিৎসা ও পরিচর্যা হয়ে ওঠে সারাদিনের দায়িত্ব। ফলে পরিবারের আয় কমে যায়, আবার চিকিৎসার ব্যয় বাড়তে থাকে।
এর সঙ্গে রয়েছে আরেকটি অদৃশ্য চাপ—সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকেই সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের করুণার চোখে দেখেন। কেউ সামাজিকভাবে দূরে রাখেন, আবার কেউ মনে করেন এই শিশু ভবিষ্যতে কিছুই করতে পারবে না। এমন ধারণা শিশুটির আত্মবিশ্বাস ও বিকাশের পথে বাধা তৈরি করে। শিক্ষা, খেলাধুলা, সামাজিক মেলামেশা এমনকি ভবিষ্যতে কর্মজীবনে যুক্ত হওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত সহযোগিতা। দ্রুত শনাক্তকরণ, সহজলভ্য চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। পরিবারকেও বুঝতে হবে, শিশুটি হয়তো অন্যদের মতো হাঁটতে বা কথা বলতে পারছে না, কিন্তু তার শেখার, ভালোবাসার, স্বপ্ন দেখার এবং নিজের মতো করে কিছু করার ক্ষমতা রয়েছে। একটি শিশু হাঁটতে পারছে না— এটি তার জীবনের একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে; কিন্তু তার স্বপ্ন দেখার অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ নয়।



