রাবি সাংবাদিকদের ওপর হামলায় শনাক্ত ছাত্রদলের ৭ নেতাকর্মী জড়িত নানা অপকর্মে

তাকবির আহমেদ ইমন, সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম, আহসান হাবিব, বিশাল চক্রবর্তী, শাহরিয়ার আলম অথই ও হাসিবুল ইসলাম হাসিব— সংগৃহীত ছবি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে শাখা ছাত্রদলের ৭ নেতা-কর্মীকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে এর আগেও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। দুজনকে একসময় সংগঠন থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল। পরে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাদের আবারও কমিটিতে রাখা হয়।
ভিডিও ফুটেজে শনাক্ত সাতজন হলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, সহ-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম (সাজু), সহ-দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথই এবং অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তী।
আহসান হাবিব আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের এই সহসভাপতি ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে সাময়িকভাবে বহিষ্কার হয়েছিলেন। একই ঘটনায় ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাসিবুল ইসলামকেও বহিষ্কার করা হয়। তিনি শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
পরে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কমিটিতেও তাদের রাখা হয়।
আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে পরে আরও একটি চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ২৪ জুন রাজশাহীর বুধপাড়া এলাকায় এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়। পরদিন ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। একই ঘটনায় মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন তিনি।
ছাত্রদলের সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন এবং সহ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলামের (সাজু) বিরুদ্ধেও ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই নেতার কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নগদের মাধ্যমে ১০ হাজার ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, মারধর ও পুলিশে তুলে দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও করা হয়।
হামলার ভিডিওতে বিশাল চক্রবর্তীকে ডেইলি স্টারের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক নূর আহসান মৃদুলকে টেলিস্কোপিক ব্যাটন দিয়ে আঘাত করতে দেখা যায়। তিনি অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ না করেই বেরিয়ে যান বলে জানা গেছে। তার ছাত্রলীগের তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহিল গালিবের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্যও রয়েছে।
অন্য শনাক্তদের মধ্যে শরিফুল ইসলাম নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি। তাকবীর আহমেদ ইমন ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও সহসভাপতি। শাহরিয়ার আলম অথই সংগীত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও সহ দপ্তর সম্পাদক। আর সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম (সাজু) ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও সহকারী সাধারণ সম্পাদক।
এদিকে হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় কারও নাম উল্লেখ না থাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে।
আজ সোমবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান ও বিক্ষোভ শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
এ সময় তারা ‘বাহ ভিসি চমৎকার, সন্ত্রাসীদের পাহারাদার’, ‘টোকাইরা হামলা করে, প্রশাসন কী করে’, ‘ছাত্রদল হামলা করে, প্রশাসন কী করে’, ‘আমার ভাইয়ের ওপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ এবং ‘শিক্ষা সন্ত্রাস একসাথে চলে না’- এমন নানা স্লোগান দেন।
রাত পৌনে ৮টার দিকে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। তিনি জানান, উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে বসতে চান। তবে আন্দোলনকারীরা জানান, তাদের প্রথম দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন না।
রাত ৮টার দিকে উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রশাসন ভবনে প্রবেশ করলে তাদের উদ্দেশে স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনকারীদের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে হামলায় জড়িতদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে সেদিনই গ্রেপ্তার করা, জড়িতদের সাময়িক বহিষ্কার করা, তিন দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে শুক্রবারের মধ্যে জরুরি সিন্ডিকেট ডেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা, যাদের ছাত্রত্ব নেই তাদের সনদ বাতিল করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা, হামলাকারীদের পক্ষ নেওয়া ও সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষকে অপসারণ ও তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগে প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরদের পদত্যাগ করা।
রাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি ইরফান তামিম বলেছেন, তাদের প্রথম দাবি ছিল ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করে মামলায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং গ্রেপ্তার করা। প্রশাসন পরদিন দুপুরের মধ্যে মামলা করে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় যে মামলা করা হয়েছে, সেখানে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।
রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা, তদন্ত ও জবাবদিহি চায় ফ্রান্সের এফবিজেএ
০৫ অক্টোবর ২০২৬
তার অভিযোগ, প্রশাসন বিষয়টি দীর্ঘায়িত করছে। হামলাকারীদের রক্ষা করতে, নাকি কোনো ছাত্রসংগঠনকে সুবিধা দিতে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ করা হচ্ছে-সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
শিক্ষার্থী শাহ পরান বললেন, সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এরপরও অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করা হয়েছে। হামলাকারীদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত প্রশাসনের সঙ্গে তারা আলোচনায় বসবেন না।
এর আগে সোমবার হামলার ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম-২-কে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মো. আরিফুল ইসলাম, ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এম আসাদুল হক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আনিসুর রহমান এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কাজী মামুন হায়দার







