শুচিবায়ু ও বিষণ্ণতার মতো মানসিক রোগের চিকিৎসায় ‘ম্যাজিক মাশরুম’

প্রতীকী ছবি
দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীরা কয়েক শতাব্দী ধরে সুস্থতার জন্য সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে আসছে সাইলোসাইব মাশরুম। বিশেষ করে মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকার আদিবাসী সংস্কৃতিতে এটি দেখা যায় বেশি। বর্তমানে এটিকে মানসিক রোগের কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের জন্য চালানো হচ্ছে গবেষণা।
সাইলোসাইবিনে এমন কিছু উপাদান আছে যা ওষুধ হতে পারে সবচেয়ে কঠিন মানসিক রোগের চিকিৎসায়। একে বলা হয় ’ম্যাজিক মাশরুম‘।
ম্যাজিক মাশরুম সারিয়ে তুলতে পারে অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) বা শুচিবায়ু, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) বা অতীতজনিত কারণে ভয় এবং মেজর ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা, গবেষণায় মিলেছে এমন প্রমাণ।
মস্তিষ্কে সাইলোসাইবিন কীভাবে কাজ করে
সাইলোসাইবিন খাওয়ার পর এটি শরীরে সাইলোসিনে রূপান্তরিত হয়। এই অণুটি তখন যোগ হয় সেরোটোনিন রিসেপ্টরের সঙ্গে। এটি পরিবর্তন ঘটায় আমাদের উপলব্ধি, চিন্তাভাবনা, সময়জ্ঞান এবং আত্মপরিচয়ে। আমাদের অনেক মানসিক রোগের মূলে থাকে নেতিবাচক নিউরন। যেটি আটকে দেয় সাইলোসাইবিন।
মস্তিষ্কের সবচেয়ে বেশি কাজ করা নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে একটি হল ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (ডিএমএন)। যার কারণে একই চিন্তা বারবার করা, আত্মকেন্দ্রিক ভাবনা আসা এবং দৈনন্দিন জীবনের হয় মানসিক দুশ্চিন্তা। ওসিডি, পিটিএসডি এবং বিষণ্ণতার মতো পরিস্থিতিতে অতিমাত্রায় কাজ করে থাকে ডিএমএন। সাইলোসাইবিন একে সাময়িকভাবে বন্ধ করে আবার চালু করে, যা আনতে পারে স্থায়ী মানসিক উন্নতি। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রমাণ করেছে সাইলোসাইবিনের সম্ভাব্য উপকারিতা।
ওসিডির জন্য সাইলোসাইবিন
২০২৬ সালের মার্চ মাসে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অফ মেডিসিনের ড. ফ্রান্সিসকো মোরেনো এবং তার সহকর্মীরা জার্নাল অফ সাইকোফার্মাকোলজিতে প্রকাশ করেন একটি র্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। যেখানে ওসিডির সুস্থতার জন্য পরীক্ষা করা হয় সাইলোসাইবিনের ডোজ।
পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ জন ব্যক্তি উচ্চ মাত্রায় সাইলোসাইবিন এবং নিম্ন মাত্রায় সাইলোসাইবিন বা সক্রিয় প্লেসিবোর (লোরাজেপাম) সাপ্তাহিক আটটি পর্যন্ত ডোজ নেন। ফলাফলে দেখা গেছে, সিলোসাইবিন নেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৭৩.৩ শতাংশ তুলনামূলক ভালো করেছে। উল্লেখযোগ্য তথ্য ৪০ শতাংশ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন এবং ছয় মাস পরেও তারা একইরকম ছিলেন।
এর আগে ড. মোরেনো ২০০৬ সালে জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশ করেন একটি প্রাথমিক গবেষণা। যেখানে দেখানো হয়েছিল, সিলোসাইবিন দেওয়া নয়জন রোগীর ওসিডি উপসর্গ ২৩ শতাংশ থেকে শতভাগ পর্যন্ত কমে গেছে এবং এর কোনো উল্লেখযোগ্য খারাপ দিক ছিল না। সেই গবেষণাটি মানসিক রোগের চিকিৎসা হিসেবে সিলোসাইবিনের উপকারিতা নিয়ে আরও গবেষণা করতে করেছিল উৎসাহিত।
প্রায় ৩০ লাখ আমেরিকানসহ পৃথিবীর অগণিত মানুষ ওসিডিতে আক্রান্ত। মোরেনো দলের গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে বোঝা যায়, কয়েক দশকের মধ্যে ওসিডি চিকিৎসার জন্য সাইলোসাইবিনই হতে পারে প্রথম নতুন থেরাপি।
পিটিএসডির জন্য সাইলোসাইবিন
অতীতে ভয়াবহ কোন দুর্ঘটনা বা খারাপ অভিজ্ঞতার বিষয় মনে গভীর ভয় তৈরি করলে এবং এর কারণে দীর্ঘমেয়াদে আতঙ্ক বজায় থাকলে একে বলা হয় পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি। এর চিকিৎসা বেশ কঠিন। আনুমানিক ১ কোটি ৩০ লাখ আমেরিকান আক্রান্ত এ সমস্যায়। অথচ দুই দশকেরও বেশি সময়ে মাত্র দুটি চিকিৎসা পদ্ধতি অনুমোদিত হয়েছে এবং দুটিরই রয়েছে ব্যাপক সীমাবদ্ধতা।
২০২৫ সালে জার্নাল অফ সাইকোফার্মাকোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণার পিটিএসডি রোগীদের ওপর সিনথেটিক সিলোসাইবিনের ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের পিটিএসডিতে আক্রান্ত ২২ জন রোগীকে দেওয়া হয় সিনথেটিক সিলোসাইবিনের ২৫ মিলিগ্রামের একটি ডোজ। ওষুধটির কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি এবং ১২ সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গগুলোর দ্রুত উন্নতি দেখা গেছে। ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীরা তাদের বেদনাদায়ক স্মৃতি ভুলে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বিষণ্ণতার জন্য সিলোসাইবিন
মানসিক রোগের মধ্যে বিষণ্ণতার চিকিৎসায় সবচেয়ে ভাল করেছে সিলোসাইবিন। যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে ট্রিটমেন্ট-রেজিস্ট্যান্ট ডিপ্রেশন এবং মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার উভয়ের জন্যই অনুমতি পেয়েছে সিলোসাইবিন সহায়ক থেরাপি হিসেবে ব্যবহারের। একইসঙ্গে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, বিদ্যমান থেরাপিগুলোর তুলনায় এটি যথেষ্ট উন্নতি করেছে রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যে।
২০২৫ সালে আমেরিকান জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত এক গবেষণা ফলে দেখা গেছে, গুরুতর বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রোগীদের ওপর প্রয়োগ করা হয় এক ডোজ সাইলোসাইবিন। দেখা যায়, তাদের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং তা বজায় ছিল ছয় সপ্তাহের ফলো-আপ পর্যন্ত। অথচ এই রোগীরা আগের একাধিক চিকিৎসায় হয়েছিলেন ব্যর্থ।
জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত আরেকটি ট্রায়ালে দেখা যায়, জার্মানিতে বিষণ্ণতার চিকিৎসায় বারবার সাইলোসাইবিন প্রয়োগের বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা দেখতে পান, প্লেসিবোর তুলনায় ২৫ মিলিগ্রাম সাইলোসাইবিনের একটি ডোজে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করে রোগীরা।
২০২৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়ালগুলোর একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের বা চরম বিষণ্ণতার জন্য সাইলোসাইবিনের ব্যাপক উপকারী এবং দিচ্ছে একটি ইতিবাচক সুরক্ষা।
ভবিষ্যৎ পথ
সাইলোসাইবিনের উপকারিতার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রেসক্রিপশন ওষুধ হিসেবে এর অনুমোদন পাওয়ার আগে এখনও পাড়ি দিতে হবে কিছু প্রতিবন্ধকতা। সাইলোসাইবিন ডোজ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল পরিবেশ প্রচলিত মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো নেই। এর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, স্বীকৃতি, স্থান এবং বড় খরচ প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে রয়েছে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ঘাটতি। আজ পর্যন্ত বেশিরভাগ ট্রায়ালে ব্যবহার করা হয়েছে ছোট নমুনা। বড় জনসংখ্যার ওপর দীর্ঘমেয়াদে এর বারবার ব্যবহার নিরাপদ কি না—এখনও এটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
যদিও আশার কথা শনিবার (১৮ এপ্রিল) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যার মাধ্যমে মানসিক রোগের চিকিৎসা হিসেবে সাইকেডেলিক ওষুধের গবেষণার জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার তহবিল দেওয়া হবে। সাইলোসাইবিন সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন গ্রহণ করতে হয় না ওষুধ। সাইলোসাইবিন অল্প কয়েকটি সহায়ক সেশনের মাধ্যমে করতে পারে মানসিক পরিবর্তন। এটি একটি ভিন্ন চিকিৎসা মডেল।
লাখ লাখ রোগী যারা একের পর এক ওষুধ চেষ্টা করেও কোনো সফলতা পাননি, তাদের জন্য সাইলোসাইবিন হতে পারে বিজ্ঞানভিত্তিক একটি আশার আলো।
সূত্র: সাইকোলজিটুডে.কম
লিখেছেন: ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো স্কুল অফ মেডিসিনের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহকারী ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক মিচেল বি. লিস্টার, এমডি।
ভাষান্তর: মাহমুদুল হাসান রিফাত

