জলবন্দি জীবনে এবার চোখ রাঙাচ্ছে চর্মরোগ ও ডায়রিয়া

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। কোথাও হাঁটু, কোথাও আবার কোমরসমান পানি। জলাবদ্ধতার নোংরা পানি মাড়িয়েই চলাচল করতে হচ্ছে অনেককে। শুধু ভোগান্তিই নয়, এই জলাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বিশেষ করে চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। যদিও হাসপাতালগুলো বলছে, বৃষ্টির প্রভাবজনিত রোগীর বড় ধরনের চাপ এখনো দেখা যায়নি, তবে পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাড়তে পারে রোগীর সংখ্যা।
রাজধানীর কাঁঠালবাগানের পেপার গলির বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হয়। তিনি জানিয়েছেন, গত শনিবার রাত থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে তার বাসার সামনে ছিল কোমর পানি। অফিসে যেতে হয়েছে ভ্যানে করে। রাতে ফেরার সময়ও হাঁটুসমান পানি মাড়িয়েই বাসায় ঢুকতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় ময়লা পানিতে চলাচলের কারণে তার পায়ে শুরু হয় চুলকানি। রফিকুল বলছিলেন, ‘তিন দিন ধরে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করেও চুলকানি কমেনি। পরে ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে ব্যবহার করার পর কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি।’
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন ভুগছেন ডায়রিয়ায়। তার অভিযোগ, জলাবদ্ধতার সময় বাসার পানির ট্যাংকে ঢুকে গেছে ড্রেনের ময়লা পানি। পরে ট্যাংক পরিষ্কার করে ওয়াসার পানি তোলা হলেও সেই পানি পান করার পর থেকেই তার পাতলা পায়খানা শুরু। তিনি আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, ফিল্টারের পানি খাওয়ার পরও সোমবার সারাদিন ডায়রিয়ায় ভুগেছেন। পরে ফার্মেসি থেকে স্যালাইন ও ওষুধ খেয়ে এখন কিছুটা সুস্থ। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নূর মোহাম্মদ। তিনি বলছিলেন, ওয়াসার পানির লাইনও তো বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে। পানি পরিষ্কার করে দিলেও মনে হয় দূষণ থেকেই গেছে। তার সঙ্গে পরিবারের আরও তিনজন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।
পেপার গলির ২৫/২-এর বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক বাবুল মিয়া জানালেন, পানিতে ট্যাংক ডুবে গেছে। রবিবার রাতেই পরিষ্কার করেছেন, তারপরও কিছু ময়লা হয়তো থেকে গেছে ভেতরে। এ কারণে সোমবার আবারও তিনি ট্যাংক পরিষ্কার করেন। এরপর পানি তোলা শুরু করেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতার পানি সাধারণত ড্রেনের বর্জ্য, ময়লা-আবর্জনা ও বিভিন্ন ধরনের জীবাণু বহন করে। এই পানি ত্বকের সংস্পর্শে এলে ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, চুলকানি, অ্যালার্জি এবং আরও বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ হতে পারে। একই সঙ্গে দূষিত পানি পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তবে জলাবদ্ধতার পানি ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গেই চর্মরোগের লক্ষণ নাও প্রকাশ পেতে পারে। সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে কখনো কখনো এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বৃষ্টির কারণে ডায়রিয়ার রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বর্তমানে রোগীর চাপ স্বাভাবিক সময়ের মতোই। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হলে ডায়রিয়া ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে। এ সময় নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে পানি অবশ্যই ফুটিয়ে অথবা ওয়াটার পিউরিফাইং ট্যাবলেট ব্যবহার করে বিশুদ্ধ করে নিতে হবে।’
একই সঙ্গে জলাবদ্ধতার ময়লা পানির সংস্পর্শে আসার পরপরই শরীরের আক্রান্ত অংশ পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা এবং ভেজা কাপড় দীর্ঘ সময় পরে না থাকার পরামর্শও দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে (এইচএমএসএস) ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে প্রতি ১ হাজার জনে গড়ে ৩৭.২৩ জন চর্মরোগে ভোগেন। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এই হার বেশি। শহরে যেখানে প্রতি হাজারে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪.৪৬, সেখানে গ্রামে হার ৩৯.৯২। গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ৪৭ হাজার ৪০টি পরিবারের ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৮৬ জন ব্যক্তির ওপর পরিচালিত জরিপে এই চিত্র পাওয়া যায়। বিবিএসের তালিকায় শীর্ষ ১০ রোগের মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে চর্মরোগ।
কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) জরিপ ২০২৫ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ রোগী কমিউনিটি ক্লিনিকে আসেন চর্মরোগের চিকিৎসা নিতে। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি তিনজন মানুষের একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে চর্মরোগে আক্রান্ত হন। আর গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ গবেষণার তথ্য বলছে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৪.৬৯ বিলিয়ন (৪৬৯ কোটি) চর্মরোগের ঘটনা শনাক্ত হয়।





