বিষণ্নতায় ভুগছেন ৪৫ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী, চিকিৎসা পাচ্ছেন না ৯৫ শতাংশ

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৪৫ জনই বিষণ্নতায় ভুগছেন। আবার বিষণ্নতায় ভোগা রোগীদের ৯৫ শতাংশের বেশি পাচ্ছেন না চিকিৎসা। এ অবস্থায় ডায়াবেটিস চিকিৎসায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন গবেষকরা।
বারডেম ও সিলেট ডায়বেটিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে পরিচালিত ‘ডেভেলপিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েটিং অ্যান অ্যাডাপ্টেড বিহেভিয়ারাল অ্যাক্টিভেশন ইন্টারভেনশন ফর পিপল উইথ ডিপ্রেশন অ্যান্ড ডায়াবেটিস’ গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চের (এনআইএইচআর) অর্থায়নে পরিচালিত হয় এ গবেষণা। এতে সহযোগিতা করে ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বারডেম এবং আর্ক ফাউন্ডেশন।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিহেভিয়ারাল অ্যাক্টিভেশন (বিএ) থেরাপির ছয়টি সেশন গ্রহণের পর ডায়াবেটিস রোগীদের বিষণ্নতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ছয় মাস পর থেরাপি গ্রহণকারীদের বিষণ্নতার গড় স্কোর ১৯ দশমিক ১ থেকে কমে ৮ দশমিক ৬-এ নেমে এসেছে। অন্যদিকে, সাধারণ চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারীদের স্কোর ১৯ দশমিক ১ থেকে কমে হয়েছে ১৭ দশমিক ১। থেরাপির সুফল স্থায়ী ছিল ১২ মাস পর্যন্ত। সিলেটে শতভাগ এবং বারডেমে ৯৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ছয়টি সেশন সম্পন্ন করেন। বিষণ্নতার পাশাপাশি উদ্বেগ কমা এবং ডায়াবেটিসের স্ব-ব্যবস্থাপনাতেও উন্নতি দেখা যায়।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও ডায়াডেম গবেষণার প্রধান অনুসন্ধানী নাজমা সিদ্দিকী এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে রক্ষণশীল হিসাবেও ৮০ লাখের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন। কিছু গবেষণায় এ সংখ্যা ২ কোটি ৯০ লাখ বা ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। বিষণ্নতা মানুষের কর্মক্ষমতা, পারিবারিক আয়, সামাজিক সম্পর্ক ও শারীরিক রোগের চিকিৎসার ফলাফলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ায়।
গবেষণার প্রটোকল অনুযায়ী, ছয়টি সেশন সাধারণত ছয় থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়। প্রতিটি সেশনের সময় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট। রোগীর সুবিধা অনুযায়ী সরাসরি অথবা দূর থেকে সেশন নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ছয়টি সেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রোগীকে নিষ্ক্রিয়তা ও নেতিবাচক অভ্যাসের চক্র থেকে বের করে দৈনন্দিন জীবনের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনা।
প্রথম সেশনে রোগীকে বোঝানো হয়, মনের অবস্থা ও দৈনন্দিন আচরণের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম সেশনে রোগীরা এসব কৌশল বাস্তবে প্রয়োগের অনুশীলন করেন। আগের সপ্তাহে কী কী কাজ করেছেন, সেগুলো করতে গিয়ে কী সমস্যা হয়েছে এবং কোন কাজ তাদের ভালো লাগা বাড়িয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হয়। এরপর নিজের পছন্দ অনুযায়ী নতুন কিছু কাজের পরিকল্পনা করা হয়। ধীরে ধীরে কঠিন মনে হওয়া কাজেও যুক্ত হতে উৎসাহ দেওয়া হয়। ষষ্ঠ সেশনে আগের পাঁচ সেশনের শিক্ষা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে ভালো থাকার জন্য ব্যক্তিগত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। রোগীদের একটি বই দেওয়া হয়, যেখানে তারা নিজেদের কাজ, অভিজ্ঞতা ও পরবর্তী পরিকল্পনা লিখে রাখতে পারেন।
যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাজমা সিদ্দিকী বলছিলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু বিশেষায়িত হাসপাতাল বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করতে হবে। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে কম খরচে এ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। এজন্য আরও গবেষণার অপেক্ষায় না থেকে বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কাজে লাগিয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
দেশে কিভাবে বাড়ছে এ রোগ
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে দেশে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪ লাখে। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ। তাদের মধ্যে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ নিজেদের রোগ সম্পর্কে জানেন না। সংখ্যায় তা প্রায় ৫৪ লাখ ২৬ হাজার মানুষ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন আক্রান্তের মধ্যে প্রায় ৩৯ জন জানেন না যে তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালে দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৩১ লাখে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে যে হারে রোগটি বাড়ছে, তাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না করলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। আইডিএফের ২০২৫ সালে প্রকাশিত অ্যাটলাসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস-সংশ্লিষ্ট কারণে আনুমানিক ৩১ হাজার ৬২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্বের অবস্থা
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) ডায়াবেটিস অ্যাটলাসের একাদশ সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ১১ দশমিক ১১ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। সংখ্যার হিসাবে এ রোগীর পরিমাণ প্রায় ৫৮ কোটি ৯০ লাখ।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৮৫ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে। তখন এ বয়সী মানুষের মধ্যে রোগটির হার দাঁড়াতে পারে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশে। বয়সভেদে ৭৫ থেকে ৭৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার সবচেয়ে বেশি, ২৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এ হার ২৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।
নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ, নারীদের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আবার গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার বেশি। শহরে এ হার ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, গ্রামে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।
আয়ের ভিত্তিতে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ডায়াবেটিসের হার সবচেয়ে বেশি, ১১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এ হার ১০ দশমিক ২১ শতাংশ এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ ডায়াবেটিস এখন শুধু ধনী দেশগুলোর সমস্যা নয়; মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও এটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
আর্ক ফাইন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, ‘বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে বিষণ্নতার উচ্চ হার এবং চিকিৎসাবঞ্চিত থাকার বিষয়টি উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে স্বল্প ব্যয়ে বিহেভিয়ারাল অ্যাক্টিভেশন থেরাপি দেওয়া সম্ভব। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ডায়াবেটিস চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, রোগী শনাক্তকরণ ও রেফারেল ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।’
বাডাসের মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন বলেছেন, ‘ডায়াবেটিস ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য এ গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ গবেষণার ফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি একটি সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরির আহ্বান জানান। ভিডিওটি সমিতির ৯৫টি কেন্দ্রে প্রদর্শনের প্রস্তাব দেন।
বাডাসের সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ খান বলছিলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিষণ্নতা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অথচ বিষণ্নতা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দিতে হবে।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিব মো. মহসীন বলেন, ‘ডায়াবেটিস শুধু একটি নির্দিষ্ট অঙ্গের রোগ নয়; এটি মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে আক্রান্ত করে। এ রোগের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই ডায়াবেটিস চিকিৎসায় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।’ গবেষণায় ব্যবহৃত বিহেভিওরাল অ্যাক্টিভেশন পদ্ধতি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও জাতীয় এনসিডি প্রোটোকলে যুক্ত করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার আশ্বাস দেন তিনি।
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. নাছির উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘প্রায় এক বছর আগে ড. নাভিদ ডায়াবেটিস চিকিৎসার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্ত করার ধারণা নিয়ে আসেন। পরে এ উদ্যোগের পাইলট কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আজ সেই উদ্যোগের ফলাফল দেখা গেল। ডায়াবেটিস চিকিৎসায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করার এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’







