রাজশাহী
বারান্দাই যখন শেষ আশ্রয়

ছবিঃ আগামীর সময়
শেষ আশ্রয়স্থল যখন হয়ে ওঠে যন্ত্রণার কেন্দ্রবিন্দু, তখন বেঁচে থাকার স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে। দেশের উত্তরাঞ্চলের চিকিৎসা বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ও চিকিৎসাসেবার প্রাণকেন্দ্র রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করিডোর আর বারান্দায় কান পাতলে কেবলই শোনা যায় রোগীদের যন্ত্রণার আর্তনাদ আর স্বজনদের কান্নার রোল। ৫০০ শয্যার অবকাঠামো নিয়ে ১২০০ শয্যার বোঝা টানা এই হাসপাতালটিতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মেঝের ধুলো আর অপরিচ্ছন্ন বারান্দাই এখন হাজারো মুমূর্ষু রোগীর শেষ ঠিকানা। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে আজ যখন ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’- এর মতো নানান স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে, তখন রামেক হাসপাতালে চিকিৎসার নামে যেনো চলছে অব্যবস্থাপনার মহোৎসব।
হাসপাতালটির অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় গেলেই চোখে পড়ে বিভীষিকাময় এক দৃশ্য। মেঝেতে শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন রাজশাহীর জোদকাদিরপুরের ভ্যানচালক আলমগীর হোসেন। সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভাঙলেও দুই দিন ধরে কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই পড়ে আছেন। একই দশা নওগাঁর অটোচালক আবু বকরের। ভুল চিকিৎসার কারণে পায়ে পচন ধরেছে, অথচ হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে থাকাই হয়ে উঠেছে তার নিয়তি। চারঘাটের দুখু মিয়ার পায়ের জখম থেকে রক্ত ঝরছে ২০ ঘণ্টা ধরে, কিন্তু সেলাই দেওয়ার মতো সময় বা সুযোগ হচ্ছে না চিকিৎসকদের। এই এক একটি মুখ যেন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একেকটি জীবন্ত কঙ্কাল।
অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের চিত্র যদি হয় যন্ত্রণার, তবে শিশু ওয়ার্ডের (২৪ ও ২৬ নম্বর) চিত্র আরও ভয়াবহ, আরও বেশি অমানবিক। ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে তিন বছরের শিশু ইউসুফ সাদ বারান্দার নোংরা পরিবেশে ধুঁকছে। মা সামিরা আক্তারের অভিযোগ, নার্সদের দুর্ব্যবহার আর অবহেলায় শিশুটির ক্যানুলা পর্যন্ত খুলে গেছে। প্রয়োজনীয় প্রতিটি ওষুধ আর ইনজেকশন কিনতে হচ্ছে হাসপাতালের বাইরের ফার্মেসি থেকে।
রমেক হাসপাতালের এই বেহাল দশার জন্য দায়ী মূলত সক্ষমতার অভাব। হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে. বিশ্বাস স্বীকার করেছেন, কাগজে-কলমে ১২০০ শয্যার হলেও অবকাঠামো ও জনবল রয়েছে মাত্র ৫০০ শয্যার। অথচ প্রতিদিন এখানে রোগী ভর্তি থাকে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার। অর্থাৎ সক্ষমতার চেয়ে আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে এই হাসপাতালকে। আর পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় সেবা বিঘ্নিত হওয়াকেই ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান তুললেন এক বিস্ফোরক অভিযোগ। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে করা হয় যাতে অতিষ্ঠ হয়ে রোগীরা দালালের প্ররোচণায় বেসরকারি ক্লিনিকে চলে যায়। সরকারি হাসপাতালে সেবার এই দুর্দশাকে পুঁজি করে একদল মানুষ গড়ে তুলেছে রমরমা কারবার। যার খেসারত দিতে হচ্ছে আলমগীর বা আবু বকরের মতো নিঃস্ব শ্রমজীবী মানুষদের।‘সুচিকিৎসা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অথচ উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় এই হাসপাতালে চিকিৎসার নামে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে।’- চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশায় এক রাশ ক্ষোভ ঝাড়লেন জামাত খান। স্বাস্থ্য সেবার এই সংকট কাটাতে কেবল রামেক হাসপাতালের জনবল বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোরও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, যাতে রামেক হাসপাতালের ওপর চাপ কমে আসে। একই সাথে বেসরকারি খাতে মানসম্মত টার্সারি লেভেলের সেবা নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি এই হাসপাতালের বারান্দায় লাশের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতরই হবে।সুচিকিৎসা পাওয়া নাগরিকের মৌলিক অধিকার, কোনো দয়া নয়। কিন্তু রামেক হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে থাকা ভ্যানচালক আলমগীরের চোখের জল বলছে, সেই অধিকার আজ হাসপাতালের করিডোরেই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় বাম পা ভেঙে যায় রাজশাহীর জোদকাদিরপুর গ্রামের ভ্যানচালক আলমগীর হোসেনের। গত রোববার (৫ এপ্রিল) ভাঙা পা নিয়ে রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু অতিরিক্ত রোগীর চাপে ঠাঁই হয়েছে অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের বারান্দাতে। মেঝেতে শুয়ে যন্ত্রণায় করছেন ছটফট। কাছে যেতেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। জানান, দুই দিন ধরে বারান্দায় পড়ে আছেন, এখনো অপারেশন হয়নি—কবে হবে তাও অনিশ্চিত।একই বারান্দায় নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চান্দাশী ইউনিয়নের অটোচালক আবু বকরকে ভাঙা পায়ে রড ও পেরেক বসানো অবস্থায় যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখা যায়। ১০ দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাম পা ভেঙে যায়। প্রথমে রামেক হাসপাতালে ভর্তি হলেও এক চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে গিয়ে প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা নিতে বলা হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর ক্ষতস্থানে দেখা দেয় সংক্রমণ, পচতে শুরু করে মাংস। পরে গুরুতর অবস্থায় আবারও রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও এখন তিনিও বারান্দাতেই পড়ে আছেন।হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডেও একই চিত্র। ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, দগ্ধ বৃদ্ধা সাবিত্রীকে মেঝেতে শুইয়ে দুই হাত উপরের দিকে বেঁধে রাখা হয়েছে। স্বজনরা জানান, বাহুর উপরের অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা এভাবে রেখেছেন। কিন্তু এমন উদাসীনতা আর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর না হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের সব আয়োজনই এসব অসহায় রোগীদের কাছে এক নিষ্ঠুর পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।















