বিবিএস’র প্রতিবেদন
অসুখে ফার্মেসি নির্ভরতা, চিকিৎসক দ্বিতীয় পছন্দ
- সরকারি-বেসরকারি ডাক্তারদের কাছে দায় না ঠেকলে যেতে চান না
- গরিবদের ৬০.৩৪ শতাংশ এবং সবচেয়ে ধনী শ্রেণিতে ৪৩.৫২ শতাংশ ফার্মেসি থেকেই চিকিৎসা নেন
- ফার্মেসিভিত্তিক সাধারণ রোগের চিকিৎসা গ্রহণের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ

কোলাজ : আগামীর সময়
চিকিৎসাসেবা নিতে মানুষের বেশি পছন্দ ফার্মেসি, কম পছন্দ ডাক্তার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে উঠে এসেছে এ চিত্র। সেখানে দেখা গেছে, জরিপের আগের ৯০ দিনে সর্বোচ্চ ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ রোগী ফার্মেসি, ডিসপেনসারির কর্মচারী বা কম্পাউন্ডারের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন। এক্ষেত্রে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বেসরকারি চিকিৎসক এবং সরকারি চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সরকারি, বেসরকারি বা প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসকদের কাছে গেলেই এক গাদা টেস্ট লিখে দেন। প্রয়োজন থাকুক আর না থাকুক। ডায়াগনেসিসের পেছনেই চলে যায় অনেকটা সময় ও অর্থ। সেই সঙ্গে থাকে হয়রানিও। এমন অবস্থা থেকে রেহাই পেতে সহজেই হাতের কাছে মানুষ বা ফার্মেসিতে বসা পল্লী চিকিৎসক, আরএমপি বা এলএলএমএফ চিকিৎসকদের থেকে সমস্যার কথা বলে ওষুধ নেন।
বিবিএস’র সর্বশেষ ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিলিটি স্ট্যাটার্স সার্ভে’ প্রতিবেদনের প্রকল্প পরিচালক মোস্তফা আশরাফুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, কেন রোগীদের প্রথম পছন্দ ফার্মেসি সেটা বলতে পারব না। কেননা বিবিএস শুধু তথ্য তুলে ধরে, কারণ বের করে না। সেটি বিবিএস’র কাজও না। এ বিষয়ে গবেষকেরা গবেষণা করে বের করতে পারেন।
রোগ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বিবিএস বলেছে, গ্যাস্ট্রিক আলসার রোগীরা ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ফার্মেসি থেকে এবং ৮ দশমিক ৩ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসাসেবা নেন। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ ফার্মেসি, ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেসরকারি এবং ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবা নেন। ডায়াবেটিসে ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেসরকারি চিকিৎসক, ২২ দশমিক ০ শতাংশ ফার্মেসি এবং ২০ দশমিক ২ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবা গ্রহণ করেন। সাধারণ রোগ যেমন জ্বর, সর্দি ও কাশিসহ অন্যন্য রোগে অধিকাংশই ফার্মেসি থেকে সেবা নিয়েছেন।
সাধারণ রোগ যেমন জ্বর, কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জায় ফার্মেসিভিত্তিক চিকিৎসা গ্রহণের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ। কিডনি রোগে প্রাইভেট চেম্বারের চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা গ্রহণ করে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ, যেখানে সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসক থেকে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ সেবা নিয়েছে। যৌনবাহিত রোগের ক্ষেত্রে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ কবিরাজ/ইউনানী/আয়ুর্বেধিক, ১২ দশমিক ৮ শতাংশ সরকারি চিকিৎসক এবং ৩২ দশমিক ১ শতাংশ বেসরকারি চিকিৎসক হতে সেবা গ্রহণ করেছেন। যক্ষা রোগে সরকারি চিকিৎসক হতে ৫৮ দশমিক ০ শতাংশ রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পল্লিচিকৎসক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা.এইচ এম জাহাঙ্গীর হোসেন আগামীর সময়কে জানান, রোগীর আস্থার প্রথম জায়গা হচ্ছে পল্লি চিকিৎসক, আরএপি, এলএলএমএফসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া চিকৎসকেরা। কেননা প্রাথমিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবার আগে মানুষ হাতের কাছে এদেরই পায়। শুধু ফার্মেসি বললে ভুল বোঝাবুঝি হবে। কেননা এই ধরনের চিকিৎসকেরাই সাধারণত ফার্মেসির ব্যবসা করেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। বিপরীতে একজন সরকারি বা বেসরকারি ডাক্তারের কাছে গেলে প্রথমে মোটা অংকের ভিজিট দিতে হয়। এরপর অপ্রয়োজনীয় টেস্ট লিখে বিদায় দেন। সেই টেস্ট আবার তাদের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে না করলে রোগীর গায়ে ছুঁড়ে ফেলে দেন। ঠিক মতো রোগীদের কথা শোনেন না। এ রকম নানা হয়রানির কারণে মানুষের আস্থার জায়গায় স্থান করে নিয়েছে ফার্মেসিতে বসা ডাক্তাররা। সেই চিত্র উঠে এসেছে বিবিএস’র প্রতিবেদনে। সরকারের উচিত যারা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় এত বড় অবদান রাখছেন তাদের আরও বেশি প্রশিক্ষিত করে স্বীকৃতি দান করা।
রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় নাজ ফার্মায় দিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোগীদের ভিড়। আবার বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রোগীদের ভিড়ে ঢোকাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। এ সময় চিকিৎসা নিতে আসা পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা হনুফা বেগম বললেন, আমরা ছেলের তিন-চারদিন ধরে জ্বর। এখানে এসে চিকিৎসা নিচ্ছি। এখন অনেকটাই কম। আমরা সব সময় এই ফার্মেসিতে এসে জাহাঙ্গীর ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিই।
বিবিএস’র প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরিপের দিন থেকে তার আগের ৯০ দিনে চিকিৎসা প্রদানকারীর কাছ থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণে লিঙ্গভেদে পার্থক্য দেখা যায়। সর্বাধিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা হয়েছে ফার্মেসি/ডিসপেনসারির কর্মচারী বা কম্পাউন্ডারের কাছ থেকে। যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৫৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৪৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। বেসরকারি চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবাগ্রহণ নারীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি পুরুষদের ক্ষেত্রে তা কম। সরকারি চিকিৎসকের সেবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুরুষদের চেয়ে নারীদের চিকিৎসা নেওয়ার হার বেশি। তবে বেসরকারিভাবে প্র্যাকটিস করা সরকারি চিকিৎসকদের চিকিৎসা প্রদানে লিঙ্গভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। অন্যান্য চিকিৎসাসেবার মধ্যে কবিরাজ, ইউনানি, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের থেকে সেবা গ্রহণ করেছে পুরুষরা বেশি।
প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চিকিৎসা গ্রহণকারীদের প্রতিষ্ঠানভেদে চিকিৎসাসেবা গ্রহণে আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে পার্থক্য রয়েছে। সর্বাধিক চিকিৎসা সেবা নেওয়া হয়েছে ফার্মেসি/ডিসপেনসারি/নিজে চিকিৎসা মাধ্যমে, যা গরিবদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং সবচেয়ে ধনী শ্রেণিতে ৪৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে সেবা নেওয়ার হার ধনী শ্রেণিতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। যেখানে গরিব শ্রেণিতে তা মাত্র ৮ দশমক ০৩ শতাংশ। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে গরিব ও ধনী শ্রেণিতে পার্থক্য তুলনামূলক কম।





