৫৭৪৫ কোটি টাকার নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবি

ছবি: আগামীর সময়
ঢাকার আমিনবাজারে নির্মীয়মান নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্পকে দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল ও পরিবেশবিধ্বংসী প্রকল্প আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে তিনটি সংগঠন।
সংগঠনগুলো হলো উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
আজ শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে বলে অভিযোগ তোলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
২০২০ সালে কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনের আওতায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয় এবং ২০২১ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও সিএমইসি’র মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পের জন্য ঢাকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ২০ একরের পাশাপাশি স্থানীয়দের ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। চুক্তির সাড়ে চার বছর পরও প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
ভূমি অধিগ্রহণ এবং বর্জ্য-সংগ্রহকার
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, অধিকাংশ মালিক জমি দিতে রাজি না হলেও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে জমি দখল করে সরকারের কাছে বিক্রি করা হয়। আদালতে মামলা চলাকালেই জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় অনেকে জমি হারিয়েও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাননি। প্রায় দুই হাজার মানুষের জীবিকা এই ল্যান্ডফিলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পুনর্বাসনের তালিকায় রাখা হয়েছে মাত্র ৪০ জনকে।
বিদ্যুতের মূল্য
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতায় চললে প্রতি বছর ৩১ কোটি ৬৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এ হিসাবে সরকার প্রতি ইউনিট ২১ দশমিক ৭৮ সেন্ট (২৬ দশমিক ৭৯ টাকা) দরে বিদ্যুৎ কিনবে, যা সৌরবিদ্যুতের দরের আড়াই গুণ এবং কয়লা-বিদ্যুতের দ্বিগুণ। উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৪৭ টাকা। কোনো কারণে তা ২০ শতাংশে নামলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কমপক্ষে ৭৫ টাকা দিতে হবে। ফলে বছরে নতুন ৫৮ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার (৭২৪ কোটি ২০ লাখ টাকা) ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সরকারের ঘাড়ের ওপর পড়বে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রস্তাবিত বাজেট অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ৪৬৭ মিলিয়ন ডলার (৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা) খরচ হবে। অর্থাৎ প্রতি মেগাওয়াটে খরচ হবে ১৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচের প্রায় আড়াই গুণ (প্রতি মেগাওয়াট ৪৭ কোটি টাকা)।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেছেন, এ পরিমাণ টাকা দিয়ে ৪২৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যেত যেখান থেকে কোনো জ্বালানি ছাড়াই বছরে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারত।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) ১০০ মিলিয়ন ডলার (১২৩০ কোটি টাকা), নয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এনডিবি) ১০০ মিলিয়ন (১২৩০ কোটি টাকা) ঋণ এবং সিএমইসি ১৫৭ মিলিয়ন (১৯৩১ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করছে। বাকি ১১০ মিলিয়ন ডলার (১৩৫৩ কোটি টাকা) কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে তা উন্মুক্ত করা হয়নি, যা প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জরিমানার আশঙ্কা
এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতিদিন ৩ হাজার টন নগরবর্জ্য সরবরাহ করবে। যদি কোনো কারণে পর্যাপ্ত নগরবর্জ্য সরবরাহ করা না হয় তাহলে প্রতি টনের জন্য ৫০ মার্কিন ডলার (৬১৫০ টাকা) জরিমানা দিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭৫০ টন নগরবর্জ্য তৈরি হয়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সিটি করপোরেশনে আরও বেশি বর্জ্য তৈরি করতে হবে। অন্যথায় জরিমানার মুখে পড়তে হবে। ফলে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের বদলে ঢাকাবাসীকে নোংরা জীবনযাপনে উৎসাহিত করছে এ প্রকল্প।
বায়ুদূষণ
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় চললে ৭৩ হাজার ৫৭৬ টন বটম অ্যাশ, ফ্লাইঅ্যাশ ও অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা, ৩৯ দশমিক ৫৬ টন বিষাক্ত গ্যাস (ভারী ধাতু, ডায়োক্সিন ও ফুরান গ্যাস) এবং ১ দশমিক ১৭ টন ক্ষতিকর গ্যাস (নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড) ঢাকার বাতাসে মিশে যাবে, যা প্রতি বছর ক্যান্সার, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধি ও অ্যাজমার প্রকোপ বাড়াবে। দিল্লির বর্জ্যবিদ্যুৎকেন্দ্র বায়ুদূষণ কমানোর চেয়ে বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কার্বন নির্গমণ বাড়বে
বলা হচ্ছে, এ প্রকল্পের ফলে ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ কমবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ভিন্ন। বর্জ্য পুড়িয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ কেজি কার্বন নির্গমন হয় যা কয়লা-বিদ্যুতের প্রায় দ্বিগুণ ও গ্যাস-বিদ্যুতের তিনগুণ। পূর্ণমাত্রায় চললে নর্থ ঢাকা বর্জ-বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ৪ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে, যার সরাসরি ভূক্তভোগী হবে ঢাকার নগরবাসী এবং বাংলাদেশের মোট কার্বন নির্গমন বাড়িয়ে দিবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নীতি সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরীর ভাষ্য, বাংলাদেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোনোর কথা বলছে, তখন এমন একটি ব্যয়বহুল ও দূষণকারী প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকের বিনিয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এআইআইবি ও এনডিবির উচিত অবিলম্বে এই প্রকল্প থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহার করা।
এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকের (এআইআইবি) পরিবেশগত ও সামাজিক নীতি (ইএসএফ) অনুসারে প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় জনসাধারণের স্বাধীন মতামত গ্রহণ করতে হবে। এ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) অনুসারে স্থানীয় শতাধিক মানুষের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রায় ৪০ শতাংশ বলেছেন যে তাদের কাছ থেকে কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া যাদের কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে মতামত জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তাও করা হয়েছে বাংলাদেশ সরকরের প্রকল্প অনুমোদনের পর।
এআইআইবি’র পরিবেশ ও সামাজিক নীতিমালা অনুসারে স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ, তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও প্রকল্পে এসব শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়নি। বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বর্জ্য পোড়ানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে । কিন্তু গত ১৬ এপ্রিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় শুধু সিএমইসি’র স্বার্থে রাষ্ট্রীয় আইন সংশোধন করে ৮৫০ ডিগ্রি অনুমোদন করার প্রস্তাব দিয়েছে।
হাসান মেহেদী এবং এনজিও ফোরাম অন এডিবির নির্বাহী পরিচালক রায়ান হাসান জোর দিয়ে বললেন, একটি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার মানদণ্ড শিথিল করার উদ্যোগ আইনের শাসন ও জনস্বার্থের পরিপন্থী।
সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্পটি বাতিল করে ঢাকা মহানগরের বর্জ্য বাছাই করে শিল্পখাতে পুনর্ব্যবহার ও জৈবসার তৈরির প্রকল্প নেওয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধির দাবি তোলা হয়।




