ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি নারীর, কারণ অবহেলা

ঘরের সব কাজ সামলানো মানুষটি যখন নিজেই অসুস্থ হন, তখন নীরবতাই যেন তার সঙ্গী হয়। নিজের কষ্ট আড়াল করে সংসারের চাকা সচল রাখতে গিয়ে নিঃশব্দে বিপদের দিকে এগিয়ে যান নারীরা। চলতি বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে উঠে আসছে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের প্রায় ৬২ শতাংশই পুরুষ। কিন্তু মৃত্যুর পরিসংখ্যানে পুরো উল্টো চিত্র। মোট ৬৭ জনের মৃত্যুর মধ্যে ৪২ জনই নারী। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৩ শতাংশ নারী। বিশেষ করে ২০ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীদের অবস্থা সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। এই বয়সের ৩৬ জন নারী মারা গেছেন, যা মোট নারী মৃত্যুর ৮৫ শতাংশের বেশি। অথচ একই বয়সের পুরুষ মারা গেছেন ২০ জন।
আক্রান্ত কম হলেও নারীদের মৃত্যু বেশি হওয়ার পেছনে বিশেষজ্ঞরা সামাজিক ও শারীরিক নানা কারণ তুলে ধরেছেন।
প্রধান কারণ অসুস্থতাকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং চিকিৎসায় অবহেলা। অনেক নারী জ্বর বা শরীর ব্যথা নিয়েও ঘরের কাজ চালিয়ে যান। শারীরিক ও পুষ্টিগত ঘাটতিও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমোনের প্রভাব এবং হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা নারীদের দ্রুত ঝুঁকিতে ফেলছে। অনেক পরিবারে নারীরা সবার শেষে খান। এতে পুষ্টিহীনতা লেগে থাকে। ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট ও হিমোগ্লোবিন কমে গেলে রক্তপাত শুরু হয়। আগে থেকেই রক্তস্বল্পতা থাকায় নারীদের শরীর এই ধকল সামলাতে পারে না। অক্সিজেনের সঞ্চালন কমে গিয়ে রোগীর অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কম থাকায় নারীরা নিজের ইচ্ছায় সময়মতো হাসপাতালে যেতে পারেন না। চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতা আর একটু দ্রুত সিদ্ধান্তই পারে এই অকাল মৃত্যু থামাতে। জ্বরকে হালকা না ভেবে প্রথম দিন থেকেই পরিচর্যা ও চিকিৎসা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২৩ হাজার ১৭৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৪ হাজার ৩০৯ এবং নারী ৮ হাজার ৮৫৯ জন। অর্থাৎ আক্রান্তদের প্রায় ৬২ শতাংশ পুরুষ। বিপরীতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বেশি। মোট ৬৭ মৃত্যুর মধ্যে নারী ৪২ এবং পুরুষ ২৫ জন। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৬২ দশমিক ৬৯ শতাংশ নারী এবং ৩৭ দশমিক ৩১ শতাংশ পুরুষ। বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণেও নারীদের ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৩৬ নারী ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। একই বয়সসীমায় পুরুষ মারা গেছেন ২০ জন, যা মোট পুরুষ মৃত্যুর ৮০ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক জনস্বাস্থ্য ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর নারীদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণের মধ্যে নারীদের শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য, হরমোনের প্রভাব, চিকিৎসা নিতে দেরি, পুষ্টিগত ঘাটতি এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবারে নারীর অসুস্থতাকে শুরুতে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও অনেক সময় দেখা যাক কী হয়— এমন মনোভাব থাকে। ফলে হাসপাতালে নেওয়া বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেরি হয়। বিপরীতে পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য অসুস্থ হলে তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।’
একই ধরনের মত সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেনের। তিনি বললেন, ‘নারীরা অনেক সময় অসুস্থ হলেও সেটিকে স্বাভাবিক মনে করে চিকিৎসা না নিয়ে ঘরে বসে থাকেন এবং ঘরের কাজ চালিয়ে যান। আবার পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের স্বাধীনতা সীমিত থাকায় চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তেও দেরি হতে পারে। ফলে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হলে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে।’






