শিশু নিখোঁজের সংখ্যা বাড়াচ্ছে শঙ্কা

চলতি বছরের ২৮ মার্চ নিখোঁজ হয় শিশু আরাফাত হোসেন রিয়াদ। রাজধানীর দক্ষিণখান থেকে ১৩ বছরের এই কোমলমতি গায়েব হওয়ার পর হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করেন অভিভাবক ও স্বজনরা। কোথাও না পেয়ে থানায় জিডি করতে যান ভুক্তভোগীর বাবা আনোয়ার হোসেন। কিন্তু অভিযোগটি নিতে অস্বীকৃতি জানায় দক্ষিণখান থানা-পুলিশ। একপর্যায়ে জিডি নিলেও একটি বারের জন্য পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বলে অভিযোগ শিশুটির বাবার। গত সাত মাসে এরকম ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ হলেও দুই সহস্রাধিক কোমলমতির শেষ পরিণতি জানে না পরিবার।
রিয়াদের অভিভাবকদের অভিযোগ, নিখোঁজের অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে পুলিশ জানায়, ২৪ ঘণ্টা পর আসবেন, এই সময় খুঁজে দেখেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টায়ও রিয়াদকে না পেয়ে ফের থানায় যান শিশুটির বাবা। এবার পুলিশ জিডি নিতে গড়িমসি করতে থাকে। পরে অনেক অনুরোধ করার পর নেয় জিডি। এরপর চার মাস পেরিয়ে গেলেও একবারের জন্যও যোগাযোগ করেনি, তদন্তের জন্য আসেনি।
‘নিজেরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে উল্টো বলে, এত বড় বাচ্চা এমনে এমনে চলে যাওয়ার কথা নয়; নিশ্চয়ই আপনারা তাকে চাপ দিতেন। সন্তানকে ফিরে পেতে সহায়তা চেয়ে পুলিশের কাছে যেন আমরা আসামি হয়ে গেলাম’— করুণ আকুতি রিয়াদের বাবা আনোয়ারের।
এভাবেই প্রতি নিয়তই নিখোঁজ হচ্ছে শিশুরা। কেউ কেউ ফিরে আসছে মায়ের কোলে। আর কেউ নির্মম লিপ্সায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। অনেকের কোনো সন্ধানই পায় না স্বজনরা। খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত— এই সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ কোমলমতি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাত মাস ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশু নিখোঁজ ও গুমের ঘটনা আতঙ্কজনক ও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা। একই সঙ্গে এসব ঘটনা দিচ্ছে সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা শিশুরা কোনো পাচার চক্রের শিকার হচ্ছে কি না, কিংবা অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কি না, তা নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে আশঙ্কা।
নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। একই সঙ্গে শিশু নিখোঁজের সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্র চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
‘ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া, বাসা থেকে একা বের হয়ে পথ ভুলে ফিরতে না পারা, অপরাধ চক্রের খপ্পড়ে পড়াসহ নানা কারণে নিখোঁজ হচ্ছে শিশুরা। এভাবে ২০২৩ সালে কোমলমতি নিরুদ্দেশ হওয়ার জিডি হয়েছে ১৭ হাজার ৮০৮টি। পরের বছর কিছুটা কমে ১৬ হাজার ৪১৪টি হলেও এই সংখ্যা বেড়ে যায় ২০২৫ সালে। গত বছর শিশু নিখোঁজের জিডি ছিল ২২ হাজার ৫৫০টি’— তথ্য দিল পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, শিশু নিখোঁজে ঘটনা পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং প্রতিটি ঘটনাই পায় গুরুত্ব।



