গণপূর্তে লটারিতে পদায়ন নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি অনুসরণ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। কর্মকর্তাদের গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন, আগে থেকে পদায়ন নির্ধারণ, জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতা উপেক্ষা এবং পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বসানোর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া পদায়নকে কেন্দ্র করে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীদের এ-প্লাস, এ, বি, সি ও ডি—পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পদায়নের ব্যবস্থা করা হলেও ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত মানদণ্ড ও মূল্যায়নপদ্ধতি স্পষ্ট নয়। কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সততা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একাধিক বাক্সে আলাদাভাবে কর্মকর্তাদের নাম রেখে লটারি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে কাদের পদায়ন করা হবে, তা লটারির আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এনে কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, আহসান হাবীব, রেজা তাইমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ ও রাশেদ আহসানসহ কয়েকজনের পদায়ন প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মাজহারুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমানের ক্যাটাগরি নির্ধারণ এবং ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, এনএসআই ও দুদকের সদর দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কর্মকর্তাদের পদায়নের যোগ্যতা, প্রশাসনিক অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাই নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ পদায়ন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রেজা তাইমুর মালিক, রাশেদ আহসান, রাজিবুল ইসলামসহ কয়েকজনের কর্মস্থল পরিবর্তন ও দায়িত্ব বণ্টনের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, একই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে কারও নাম লটারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও কারও নাম বাদ পড়েছে। কেন এমন হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযোগ অনুযায়ী, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার বদলি ও পদায়নে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের পাশাপাশি কথিত একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের ঘটনা ঘটেছে। এ অভিযোগ যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, সম্পদ কেনার উৎস এবং নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদের তথ্য পরীক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে তা সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেছেন, নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য বন্ধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় পদায়ন করার চেষ্টা চলছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘গত ৩০ জুলাই ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে, আগস্টে ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে এবং গত ১৬ আগস্ট ২১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ১৯০ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৩০ জনকে লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন করা হয়েছে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য একটাই-বদলি বাণিজ্য বন্ধ করা, সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া। যোগ্যতা অনুযায়ী যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় বসানোই আমাদের লক্ষ্য। বিশেষ করে রূপপুর নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের যে বদনাম হয়েছে, সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই। আমরা গণপূর্ত বিভাগকে স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই।’



