Agamir Somoy E-Paper
বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
প্রজন্মকে বইয়ে ফেরাচ্ছেন খালিক উদ্দিন
বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সংস্কৃতি

স্মরণে শৈল চক্রবর্তী

যার জীবনজুড়ে জল্পনা ছিল ‘কল্পনা যেন বাঁধ না মানে’

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৯
যার জীবনজুড়ে জল্পনা ছিল ‘কল্পনা যেন বাঁধ না মানে’

শৈল চক্রবর্তী (৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯০৯ — ১৪ অক্টোবর, ১৯৮৯)

বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে থেকেও নিজের সৃষ্টিকর্ম দিয়ে যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে বেঁচে থাকেন। শিল্পী শৈল চক্রবর্তী তাঁদেরই একজন। কার্টুনিস্ট, ইলাস্ট্রেটর, চিত্রশিল্পী, গ্রন্থকার এবং বাংলার আধুনিক পাপেট্রির পথপ্রদর্শক— এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটি আজও শিক্ষিত বাঙালির মনোজগতে এক জীবন্ত উপস্থিতি। তাঁর জন্ম ১৯০৯ সালে, হাওড়া জেলার আন্দুল-মৌরিগ্রামে। পিতা উদয়নারায়ণ চক্রবর্তী ছিলেন আন্দুল হাইস্কুলের শিক্ষক, মা রানি চক্রবর্তী গৃহিণী। শৈল চক্রবর্তীর পুরো নাম শৈলনারায়ণ চক্রবর্তী, তবে সৃষ্টিশীল জগতে তিনি ‘শ্রী শৈল’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।

শৈল চক্রবর্তী আন্দুল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এরপর হাওড়া নরসিংহ দত্ত কলেজ থেকে অঙ্কে অনার্স নিয়ে পাশ করেন। কলকাতার সিটি কলেজ থেকেও তিনি অঙ্কে অনার্স করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আঁকা শেখার জন্য তিনি কোনও দিন কোনও আর্ট কলেজে পা রাখেননি। তাঁর কোনও শিক্ষাগুরু ছিল না। তবুও তাঁর অবজারভেশন ছিল তুখোড়। এই স্বশিক্ষিত শিল্পীই পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের বহু অবিস্মরণীয় চরিত্রকে রেখায় বন্দি করেছেন, যা আজও মানুষের মনে চুম্বকসম গেঁথে আছে।

শৈলনারায়ণ চক্রবর্তীকলেজে পড়ার সময় থেকেই কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও লেখক-শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। বন্ধু হিসেবে পাশে পেয়েছিলেন সমর দে, প্রমথ সমাদ্দার ও পরিমল গোস্বামীদের। লেখাপড়া শেষ করে তিনি প্রথমে প্রসাধন তৈরির একটি ছোট কারখানা বাড়িতেই বানিয়ে নেন। সাবান, আলতা, সিঁদুর তৈরি করে বাড়ি-বাড়ি বিক্রি করতেন। কিন্তু সে ব্যবসা টেকেনি। এরপর বিজ্ঞাপন জগতের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয় এবং আঁকা— যা ছিল তাঁর শখ— ধীরে ধীরে পেশায় পরিণত হতে থাকে।

শৈল চক্রবর্তী মানেই শিবরাম চক্রবর্তী— শিবরাম চক্রবর্তী পড়তে গিয়েই আমি তাঁর সন্ধান পেয়েছিলাম, সে সময়ের অখণ্ড বাংলায় সৃষ্টিশীলতার জগতে এই জুটি ছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। শিবরামের লেখা ‘হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন-বিনিদের’ নাজেহাল অবস্থা, তাদের ছটফটানি, দুরন্ত গতি শৈলের আঁকায় যেন বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইত। কলারওয়ালা সিল্কের শার্ট, ধুতির কোঁচা লুটিয়ে পড়া, ঘাড় অবধি চুল— শিবরামের এই চেহারাটা শৈল এত নিখুঁতভাবে আঁকতেন যে, সেই পোর্ট্রেটই আজও মানুষের মনে শিবরামের প্রতিচ্ছবি হয়ে গেছে।

শিবরাম চক্রবর্তী নিয়মিত যেতেন শৈলদের বাড়িতে। গল্প লেখা হলে পাণ্ডুলিপি হাতে চলে আসতেন। লেখায়-রেখায় জমে উঠত আসর। এই আসরে যোগ দিতেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, মনোজ বসু, সুনির্মল বসু, দীনেশ দাস, আশাপূর্ণা দেবী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, দীপ্তেন্দ্রকুমার সান্যাল, বিজন ভট্টাচার্য, বিমলচন্দ্র ঘোষ সহ আরও অনেক গুণী মানুষ। কী একটা ক্লাব; ভাবা যায়!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি গল্প প্রগতি সংহার আর ল্যাবরেটরির ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন শৈল চক্রবর্তীশিবরামের পাশাপাশি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টেনিদা’ সিরিজেরও অনেক ছবি শৈল চক্রবর্তীর আঁকা। পটলডাঙার টেনিদাকে তিনি চোঙা প্যান্ট এবং ধুতি-শার্ট দুটোই পরিয়েছিলেন। এছাড়া তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’, প্রবোধকুমার স্যানালের ‘বনহংসী’-র অলংকরণও তাঁরই কৃতিত্ব।

শৈল চক্রবর্তীর ইলাস্ট্রেশনের মান কত উঁচু ছিল, তা বোঝার জন্য একটি ঘটনা যথেষ্ট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও নিজের গল্পের ছবি কাউকে আঁকতে দিতেন না। তিনি মনে করতেন, এখানে এমন শিল্পী নেই, যিনি তাঁর ভাবনাকে তুলি-কলমে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটেছিল দু’বার। ‘প্রগতি সংহার’ এবং ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পের ক্ষেত্রে।

আনন্দবাজার পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক শৈল চক্রবর্তীকে দিয়ে গুরুদেবের ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পের ছবি আঁকিয়ে নিয়েছিলেন। সে ছবি দেখে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত খুশি হয়ে ছাপার অনুমতি দেন পুজোসংখ্যায়, ১৯৪০ সালে। তার পরের বছর আবার আনন্দবাজারের শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের আর একটি গল্প ‘প্রগতি সংহার’-এর ছবিও আঁকেন শৈল চক্রবর্তী। পরপর দু’বার। ১৯৪০-’৪১ সালে শান্তিনিকেতনের পরিমণ্ডলের বাইরে তিনিই প্রথম রবীন্দ্রসাহিত্যের অলংকরণ করেছিলেন।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করা যায়— বাংলায় প্রকাশিত সত্যজিৎ রায়ের প্রথম গল্প ‘বর্ণান্ধ’-র ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন শৈল চক্রবর্তী। তা অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪২ সালের ২২ মার্চ। সেখানেই আরও দু’টি গল্পের ছবি এঁকেছিলেন— ‘Abstractions’ ও ‘Shades of Grey’।

শৈল চক্রবর্তীকে অনেকে এ বঙ্গে স্ট্রিপ কার্টুনেরও জনক বলে মনে করেনশৈল চক্রবর্তীকে অনেকে এ বঙ্গে স্ট্রিপ কার্টুনেরও জনক বলে মনে করেন। তাঁর ‘লিটল ডাকু’ এবং প্রতুলচন্দ্র লাহিড়ীর ‘খুড়ো’ ছিল স্ট্রিপ কার্টুনের পায়োনিয়ার। ‘লিটল ডাকু’ এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে, অমৃতবাজার পত্রিকায় টানা ষোলো বছর ধরে বেরিয়েছিল। যদিও দুটোই ইংরেজিতে প্রকাশিত হতো। লিটল ডাকুর সঙ্গে তাঁর পুত্র চিরঞ্জিতের মিল আছে— চিরঞ্জিতের কপালে চুল যেমন হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকত, ডাকুরও তাই। শৈল বলতেন, সেই মুখ আর চুল নাকি ছেলের চেহারা দেখে আঁকা। এ জন্য ছোটবেলায় চিরঞ্জিতকে সকলে ‘ডাকু’ বলে ডাকত।

কার্টুন আঁকার শেষে শৈল সই করতেন ‘Alias’। এই ছদ্মনামের মধ্যে লুকিয়ে থাকত শৈল। ইংরেজি শব্দটি উল্টে নিলেই হল। প্রায় ৩৫ বছর তিনি অমৃতবাজার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাবনায় তিনি এঁকেছিলেন কলকাতা পুরসভার লোগো। কর্পোরেশনের লোগোটিতে এখনও তাঁর আঁকা ছবি উজ্জ্বল।

শৈল চক্রবর্তীর সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত বাংলার পুতুলনাচ বা পাপেট্রি। তাঁকে ভারতে মডার্ন পাপেট্রির পথপ্রদর্শক বলা যায়। মন্দার মল্লিক এবং শৈল চক্রবর্তী এ দেশে প্রথম কার্টুন ফিল্ম তৈরি করেন। অ্যানিমেশন ফিল্ম ‘চ্যাঙা ব্যাঙা’ বোধহয় তার নাম ছিল। সুনির্মল বসুর লেখা নিউ থিয়েটার প্রডাকশনের ‘মিচকে পটাশ’ অ্যানিমেশনও তাঁরই সৃষ্টি।

লেখায়-রেখায় অনবদ্য এক জীবন কাটিয়েছেন আপন ছন্দে শৈল চক্রবর্তী। কার্টুন এঁকেছেন, অলংকরণ করেছেন; সেইসঙ্গে পাপেট্রি নিয়েও করেছেন কাজকিন্তু পাপেট্রি শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ পারিবারিক পরিসরে। নিজের বাড়িতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি সংস্থা— ‘পুতুলরঙ্গম’। নিজে পুতুল গড়তেন। প্লাস্টিসিন বা আর্টিফিশিয়াল ক্লে দিয়ে পুতুলের মাথা বানাতেন। তার উপর কাগজ লাগানো হত আঁঠা দিয়ে। সেটা শুকানো হয়ে গেলে ভেতর থেকে প্লাস্টিসিন বের করে নেওয়া হত। আঠা দিয়ে জোড়া কাগজও শক্ত হয়ে যেত। এ ভাবে তৈরি হত পেপিয়ামেশি পুতুল।

তিনি সুতোয় টানা ও পুতুলের ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে দু’রকম ভাবেই খেলা দেখাতেন। বাড়িরই একটা ছোট গোল টেবিল নেওয়া হত পাপেট শো-এর জন্য। জানালার পরদাগুলো সরিয়ে, সেখানে শাড়ি টাঙানো হত। টর্চ লাগিয়ে, তাতে আলো ফেলা হত। টেবিলের নীচের ফাঁকে আলো দেওয়া হত। তার পর শাড়ি দিয়ে ঢেকে শুরু হত পাপেট্রি। দু’পাশ থেকে মঞ্চে আনা হত পুতুল।

বাবা তখন সিএলটির কমিটি মেম্বার ছিলেন। তাই কর্তৃপক্ষ তাঁকে পাপেট্রি শেখার জন্য চেকোস্লোভাকিয়া যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু তিনি বলেন, পাপেট্রি তাঁর কাজের একটা অংশ, প্রধান নয়। অতএব তিনি যাবেন না। যদিও সকলে পছন্দ করায় পরিবারের সকলে ধীরে-ধীরে অনেক জায়গায় পাপেট শো করতে শুরু করেন। বেথুন কলেজ, রামকৃষ্ণ মিশন, মহাজাতি সদনের মতো জায়গায় শো করা হয়। ক্রমশ ব্যাপারটা এত জনপ্রিয় হয়ে যায় যে, প্রবীর মজুমদার নামে এক বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। তৈরি হয় দল ‘পুতুল রঙ্গম’। পরে এটা অনেক বড় হয়।

শৈল চক্রবর্তীর স্ট্রিপ কার্টুন লিটল ডাকুশৈল চক্রবর্তীর পুত্র চিরঞ্জিত চক্রবর্তী একবার তাঁকে নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেদিনের কথা চিরঞ্জিত লিখে রেখেছেন এভাবে— সত্যজিৎ রায়ের গলার স্বরে তখন আনন্দ-শ্রদ্ধা মিলেমিশে একাকার। দীর্ঘদেহী সে মানুষটির সামনে বসে তাঁর বাবা। শৈল চক্রবর্তীর চোখের জল সেদিন বাঁধ মানেনি। মানিকদা বলে চলেছেন, ‘আপনি বিরাট মাপের শিল্পী...’ বাবার গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না। আর চিরঞ্জিত পাশে নিশ্চল। মানিকদা তখন গগনচুম্বী এক নাম, কিন্তু বাবা তত ‘বড়’ নন। সেদিন তাঁর চোখ দিয়ে চিরঞ্জিত বুঝেছিলেন, কী বিরাট গুণী মানুষ তাঁর বাবা!

সত্যজিৎ রায় সেদিন বলেছিলেন, ‘আপনি যে কত বড় মাপের শিল্পী, তার মূল্যায়ন কিন্তু হল না।’ কিন্তু সেদিন মানিকদার সঙ্গে দেখা করে ও-বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়ও শৈল চক্রবর্তীর চোখে জল দেখেননি চিরঞ্জিত, মুখে হাসি দেখেছিলেন।

শৈল চক্রবর্তীর আঁকা বিজ্ঞাপনশৈল চক্রবর্তী প্রথমে হাওড়া থেকে এসে কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের কাছে একটি মেসে ওঠেন। পরে শ্যামবাজারের শ্যামপার্কের কাছে একটি বাড়িতে সংসার-জীবন শুরু করেন। সেখানে বছর আটেক থাকার পরে ১৯৪৫-এ কালীঘাটের সদানন্দ রোডের বাড়িতে বসবাস। ঢাকুরিয়ায় বাড়ি করেন ১৯৫৬-’৫৭ নাগাদ।

তাঁর স্বভাবে একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য ছিল— শিল্পী হয়েও সাংসারিক বিষয়ে উদাসীন ছিলেন না। নিয়মিত বাজার করা, ছেলেমেয়েদের প্রতি যত্ন— অবহেলা ছিল না কোনও দিকেই। প্রতি বছর পুজোর ছুটিতে বেড়াতে যাওয়া ছিল রুটিন। ঝাড়গ্রাম, মধুপুর, পুরী, বারাণসী, লখনউ— এই জায়গাগুলোতে কয়েকবার গিয়েছেন।

নানা খাবার বানানোর হাত ছিল পাকা, সেখানেও থাকত শিল্পের ছোঁয়া। বিজয়া দশমীর জিভেগজা বানাতেন ছেলেদের নিয়ে। লেচি কেটে বেলে তাতে ছুরি দিয়ে নানা কাটিং করে তেলে ভেজে রসে ডুবে যখন উঠত, তখন দেখার মতো পশুপাখি প্লেটে আসত। বাবা যে কাঠবিড়ালিটা বানাতেন, সকলের নজর থাকত তার দিকে। যাতে ওটা ফুলে না যায়, তার জন্য ওর গায়ে খাঁজ কেটে দিতেন, আর তা হয়ে যেত কাঠবিড়ালির গায়ের রোম!

শৈল চক্রবর্তীর করা দুটি বিখ্যাত বইয়ের প্রচ্ছদআবার এক-একদিন হত আঁকার ওয়ার্কশপ। ফিঙ্গার পেন্টিং করতে দিতেন ছেলেমেয়েদের। পেনসিল, তুলি নিয়ে আঁকা মুখের কথা নয়, তাই বলতেন ও সব নয়, ফিঙ্গার পেন্টিং করো। মাকে এক হাঁড়ি অ্যারারুটের আঠা বানাতে হত। প্লেটে রং থাকত। সেই রং ওই আঠার সঙ্গে মিশিয়ে, আঙুলে নিয়ে গাছ, ফুল, পাখি আঁকা চলত।

জীবনের শেষ দিকে শৈল চক্রবর্তী চিত্রকলার দিকে ঝুঁকেছিলেন। জলরঙ ও তেলরঙ— এই ছিল মাধ্যম। পুত্র চিরঞ্জিতের কথায়, ‘বাবা আমাদের রঙের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে আঁকতে শিখিয়েছেন। ওই আঁকার মধ্যে ইউরোপীয়, চৈনিক, জাপানি আঙ্গিকের মধ্যে মিশে গিয়েছিল যামিনী রায়ও।’

প্রায় চার দশক ধরে দাপিয়ে কাজ করে গিয়েছেন শৈল চক্রবর্তী। ১৯৮৯ সালে তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার কয়েক বছর আগেও আমেরিকার নিউ জার্সিতে তাঁর আঁকা ছবির একক প্রদর্শনী হয়েছিল, তার আগে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরোতে। দু’জায়গাতেই তাঁর সব ছবি বিক্রি হয়ে যায়।

শৈল চক্রবর্তীর আঁকা চিত্রকর্ম ডিভাইড অ্যান্ড রুলতাঁর সৃষ্টি ‘বেজায় হাসি’, ‘চিন্তাশীল বাঘ’, ‘ঘটোৎকচ বিজয়’, ‘স্বর্গের সন্ধানে মানুষ’, ‘কার্টুন’, ‘কৌতুক’, ‘যাদের বিয়ে হল’, ‘যাদের বিয়ে হবে’, ‘আজব বিজ্ঞান’, ‘চিত্রে বুদ্ধজীবন কথা’, ‘বেলুন রাজার দেশে’, ‘কালোপাখি’, ‘টুলটুলির দেশে’, ‘কৃপণের পরিণাম’ সহ প্রায় ২৫টি রচিত গ্রন্থ। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘বেজায় হাসি’। ‘কালোপাখি’, ‘মানুষ এল কোথা থেকে’, ‘গাড়িঘোড়ার গল্প’ ও ‘ছোটদের ক্রাফট’-এর জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন চার বার।

আজ যখন বাংলার পাপেট্রি শিল্প নতুন প্রজন্মের হাতে বদলে যাচ্ছে, যখন ডিজিটাল অ্যানিমেশন পুতুলের সুতো কেটে দিচ্ছে, তখন শৈল চক্রবর্তীর জীবন ও কর্ম আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শিল্পের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, দরকার অবজারভেশন ও নিরন্তর অনুশীলন। তিনি দেখিয়েছেন, একজন শিল্পী একই সঙ্গে সাংসারিক ও সৃষ্টিশীল হতে পারেন— এ দুটো পরস্পরবিরোধী নয়।

পরবর্তী প্রজন্মের কার্টুনিস্ট ঋতুপর্ণ বসু এঁকেছেন শৈল চক্রবর্তীকেতাঁর জীবনী থেকে আরও একটি শিক্ষা মেলে— স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা না করা। তিনি আজীবন ফ্রিল্যান্সিং করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। মাঝে মাঝে আসত কঠিন সময়। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পরিবারকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়তেন। ফিরে আসতেন অফুরন্ত মানসিক উৎসাহ নিয়ে। শুরু করতেন নতুন উদ্যমে কাজ। শৈল চক্রবর্তীর প্রিয় কথা ছিল, ‘কল্পনা যেন বাঁধ না মানে।’ এই কথাটি তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্বে সত্য হয়েছে। কার্টুন আঁকা থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসাহিত্যের অলংকরণ, পুতুল তৈরি থেকে পাপেট শো পরিচালনা— সবখানেই তিনি কল্পনাকে বাঁধনমুক্ত রেখেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতার স্থান ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

আজও ঢাকার বইয়ের দোকানে যখন শিশু-কিশোররা ‘টেনিদা’ বা ‘ঘনাদা’র নতুন সংস্করণ হাতে নেয়, তখন তাদের অজান্তেই তারা শৈল চক্রবর্তীর আঁকা চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়। তাঁর আঁকা শিবরাম চক্রবর্তীর মুখ আজও বাংলা সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অমরত্বই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শৈল চক্রবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি হয়তো পুরোপুরি পাননি, কিন্তু সন্ধানী বাঙালির হৃদয়ে তিনি এক চিরকালীন জায়গা করে আছেন।

শৈল চক্রবর্তীশিমুল সালাহ্উদ্দিন
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    মিয়ানমার থেকে পানির নিচ দিয়ে বিশেষ ক্যারিয়ারে আনা হতো ইয়াবা

    মিয়ানমার থেকে পানির নিচ দিয়ে বিশেষ ক্যারিয়ারে আনা হতো ইয়াবা

    যশোরে অভিনেতা সমু চৌধুরীকে পিটিয়ে জখম

    যশোরে অভিনেতা সমু চৌধুরীকে পিটিয়ে জখম

    নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরে তোপের মুখে ড. ইউনূস

    নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরে তোপের মুখে ড. ইউনূস

    বিদেশিদের হাতে আটকে পোশাক রপ্তানির ৮৭ হাজার কোটি টাকা

    বিদেশিদের হাতে আটকে পোশাক রপ্তানির ৮৭ হাজার কোটি টাকা

    কোটালীপাড়ায় সরকারি খাল দখল করে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ

    কোটালীপাড়ায় সরকারি খাল দখল করে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ

    ড. ইউনূস বলেছেন, ‘এটাই ফ্যাসিবাদীদের চরিত্র’

    ড. ইউনূস বলেছেন, ‘এটাই ফ্যাসিবাদীদের চরিত্র’

    ডিসি-এসপি গিয়ে মুক্ত করলেন ভিসি শরীফুলকে, চুয়েট ছাড়লেন অ্যাম্বুলেন্সে

    ডিসি-এসপি গিয়ে মুক্ত করলেন ভিসি শরীফুলকে, চুয়েট ছাড়লেন অ্যাম্বুলেন্সে

    হেনস্তার ঘটনা ড. ইউনূসের ওপর প্রভাব ফেলেনি : লামিয়া মোরশেদ

    হেনস্তার ঘটনা ড. ইউনূসের ওপর প্রভাব ফেলেনি : লামিয়া মোরশেদ

    ৩৫ বছরের পর আইনজীবী হওয়ার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে : আইনমন্ত্রী

    ৩৫ বছরের পর আইনজীবী হওয়ার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে : আইনমন্ত্রী

    ড. ইউনূসকে হেনস্তা ‘আনচ্যালেঞ্জড’ যাবে না : উপদেষ্টা জাহেদ

    ড. ইউনূসকে হেনস্তা ‘আনচ্যালেঞ্জড’ যাবে না : উপদেষ্টা জাহেদ

    অবরুদ্ধ চুয়েট উপাচার্যের রাত পার হলো যেভাবে

    অবরুদ্ধ চুয়েট উপাচার্যের রাত পার হলো যেভাবে

    কালীগঞ্জে আলাদা দুর্ঘটনায় সড়কে ঝরল দুই প্রাণ

    কালীগঞ্জে আলাদা দুর্ঘটনায় সড়কে ঝরল দুই প্রাণ

    আবুধাবিতে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি প্রকৌশলীর স্ত্রী-ছেলের মৃত্যু

    আবুধাবিতে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি প্রকৌশলীর স্ত্রী-ছেলের মৃত্যু

    ড. ইউনূসকে হেনস্তার প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল— সূর্যের দিকে ঢিল ছুড়লে কী হয়

    ড. ইউনূসকে হেনস্তার প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল— সূর্যের দিকে ঢিল ছুড়লে কী হয়

    নিউগিনি প্রোপার্টিজে ভাঙচুর-লুটপাট মামলায় প্রধান আসামির জামিন

    নিউগিনি প্রোপার্টিজে ভাঙচুর-লুটপাট মামলায় প্রধান আসামির জামিন