‘রইদ’ নিয়ে দর্শকের প্রশ্নই সিনেমার সার্থকতা : মেজবাউর রহমান সুমন

ছবি : আগামীর সময়
রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৫০৫ নম্বর কক্ষ শনিবার বিকেলে ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। নির্ধারিত আসন শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত চেয়ার আনা হলেও অনেক দর্শককে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে হয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অ্যালামনাই ফোরাম, প্রাক্তন সভ্য সংঘ আয়োজিত ‘আড্ডায় রইদ উদযাপন’ অনুষ্ঠানে এমন চিত্র দেখা যায়। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক আগামীর সময়।
দুই পর্বের এই আয়োজনে প্রথম পর্বে ‘রইদ’ চলচ্চিত্র নিয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন এশীয় চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজু এবং চলচ্চিত্র সমালোচক ও কাট টু সিনেমা পত্রিকার সম্পাদক বিধান রিবেরু।
দ্বিতীয় পর্বে চলচ্চিত্রটির নির্মাণ-অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন, অভিনেত্রী নাজিফা তুষি, চিত্রগ্রাহক জোয়াহের মুসাভভির জ্যোতি এবং সংগীত ও আবহ পরিকল্পক রাশীদ শরীফ শোয়েব। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন গ্রিক দর্শন ও নাটকের অনুবাদক শাহনেওয়াজ কবির।
আলোচনায় ড. জাকির হোসেন রাজু বলেছেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত বাণিজ্যিক ও আর্ট ফিল্ম—এই দুই ধারার সিনেমার কথা বলা হয়। রইদ এমন একটি চলচ্চিত্র, যা দর্শকের সামনে অসংখ্য প্রশ্ন রেখে যায়। পাগলী কোথা থেকে আসে, কোথায় চলে যায়—এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়েই সিনেমাটি জাদুবাস্তবতার এক ভিন্ন জগৎ নির্মাণ করেছে। আমাদের পাওয়া-না-পাওয়া ও বেদনার অনুভূতিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে রইদ।
চলচ্চিত্র সমালোচক বিধান রিবেরু বলেছেন, ‘আমাদের পাঠ্যক্রমে সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যকলা ও নাটক থাকলেও চলচ্চিত্র নেই। অথচ চলচ্চিত্রই সব শিল্পমাধ্যমের সমন্বিত রূপ। ‘রইদ এমন একটি চলচ্চিত্র, যা দেখার জন্য দর্শকেরও প্রস্তুতি প্রয়োজন। এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতার ভেতর থেকে নির্মিত এক সিনেমা’, যোগ করেন তিনি।
ষাটের দশকে পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্রে যে সম্ভাবনার উন্মেষ ঘটেছিল, পরে তা অনেকটাই থেমে যায় উল্লেখ করে বিধান রিবেরু বলছিলেন, ‘জহির রায়হান, আলমগীর কবির ও তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর সেই ধারা বাধাগ্রস্ত হয়। এখন নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা আবার সেই পথ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। মেজবাউর রহমান সুমন তাদের অন্যতম।’
নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন বললেন, ‘রইদ এর গল্পটা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শুনেছিলাম। কিন্তু সরলভাবে গল্প বলার চেয়ে আমি প্রশ্নের মধ্যেই সিনেমাটিকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছি। সবাই যদি একইভাবে ব্যাখ্যা করে, সেটা আমি চাইনি। রইদ আমার কাছে একটি অনুভূতি, যার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়েছি। সেখানে পশ্চিমা শিল্প নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হয়। অথচ সুলতান, হাছন রাজা কিংবা শাহ আবদুল করিমকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিই? আমাদের নিজেদের সিনেমা নিয়েও আরও বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।’
‘পাগলী’ চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নাজিফা তুষি বললেন, আমি শহরে বড় হয়েছি। তাই চরিত্রটি করতে গিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই সিনেমায় কাজ করার পর বুঝেছি, আমার ভেতরেও এক ধরনের ‘পাগলী’ আছে।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে চমক হিসেবে দর্শক নাঈমুর রহমান নাঈম অভিনেত্রী নাজিফা তুষির হাতে নিজের গাছের একটি তাল উপহার দেন।
মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘রইদ’ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যঘেরা চলচ্চিত্র। এতে অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি, মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, গাজী রাকায়েতসহ আরও অনেকে। প্রত্যন্ত গ্রামীণ বাংলার প্রান্তিক সমাজের দুই মানুষের সম্পর্ককে লোককাহিনির আবহে তুলে ধরা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে।
গত ঈদুল আজহায় মুক্তির পর টানা দুই মাসের বেশি সময় দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছে ‘রইদ’। বর্তমানে চলচ্চিত্রটি ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হচ্ছে। সম্প্রতি এটি ভিয়েতনামের মর্যাদাপূর্ণ দা নাং এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবের সমালোচক বিভাগে ‘সেরা এশীয় চলচ্চিত্র’ পুরস্কার অর্জন করেছে।







