Agamir Somoy E-Paper
শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
অসুস্থদের ঠিকানা তাজুলের বৃদ্ধাশ্রম
শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সংস্কৃতি

লালন দিবস

জাত-পাতের বিভেদ ভুলতে বলা এক বাউল দার্শনিক

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১
জাত-পাতের বিভেদ ভুলতে বলা এক বাউল দার্শনিক

লালন সাঁই (১৭ অক্টোবর, ১৭৭৪ – ১৭ অক্টোবর, ১৮৯০)। ছবি: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা

‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/ লালন কয়, জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।’ বাংলা অঞ্চলের চিন্তার ইতিহাসে লালন সাঁইয়ের সবচেয়ে বড় অবদান এ প্রশ্নেই নিহিত, যা যুগপৎ সরল অথচ বিস্ফোরক: জাত যদি চোখে দেখা যায় না, হাতে ধরা না যায়, তবে মানুষে মানুষে বিভাজন কে টানল?

এই একটি প্রশ্নই বাংলার ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি—সবকিছুর ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়। আঠারো শতকের শেষ থেকে উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত—ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, জাতিভেদ, নারী-পুরুষের অসমতা—সবকিছুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লালন একটি বিকল্প জীবনদর্শন নির্মাণ করতে চেয়েছেন, যার কেন্দ্রে ছিল মানুষ। তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি, কিন্তু তাঁর গান ও দর্শন গভীর মানবতাবাদী।

তিনি ছিলেন একাধারে আধ্যাত্মিক ফকির সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক। তিনি ছিলেন অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। লালনকে বাউল গানের অগ্রদূতদের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এবং তাঁর গান উনিশ শতকে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এখনো তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। তাঁর গানগুলোতে উঠে এসেছে মানবধর্ম, জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, গুরুবাদ, আত্মজিজ্ঞাসা—এমন বিষয় যা আজও মানুষকে সহিষ্ণুতা, প্রেম ও আত্মঅনুসন্ধানের পথে আহ্বান জানায়।

নন্দলাল বসুর আঁকা লালন সাঁইয়ের প্রতিকৃতিলালনের জন্ম নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। গবেষকদের মতে, তিনি ১৭ অক্টোবর ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত বাংলায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান হিসেবে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ভাড়ারা গ্রাম বা ঝিনাইদহের হরিশপুর অঞ্চলের কথা বলা হয়। কোনো কোনো সূত্রে পাওয়া যায়, লালন ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলার হারিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে বলে উল্লেখ করা হয়। এক সূত্র থেকে জানা যায়, তার পিতার নাম কাজী দরীবুল্লাহ্ দেওয়ান, পিতামহের নাম কাজী গোলাম কাদির ও মাতার নাম আমিনা খাতুন। কাজী তাদের বংশগত উপাধি। গবেষকদের ধারণা, লালন শাহের আরো দুই ভাই ছিলেন—আলম শাহ্ ও কলম শাহ্। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে আলম ও কলম নামের দুই ভাই মৃত্যুমুখে পতিত হন।

লালনের জীবন সম্পর্কে জানার প্রধান সূত্র জনশ্রুতি ও শিষ্যদের বর্ণনা। তার সবচেয়ে অবিকৃত তথ্যসূত্র তার নিজের রচিত ২৮৮টি গান। কিন্তু লালনের কোনো গানে তার জীবন সম্পর্কে কোনো তথ্য তিনি রেখে যাননি, তবে কয়েকটি গানে তিনি নিজেকে ‘লালন ফকির’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মৃত্যুর পনেরো দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত হিতকরী পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, ‘ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাঁহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশত কিছুই বলিতে পারে না।’

হিতকরী পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিবন্ধে বলা হয়েছে, লালন তরুণ বয়সে একবার তীর্থভ্রমণে বের হয়ে পথিমধ্যে গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন তার সাথীরা তাকে মৃত ভেবে পরিত্যাগ করে যার যার গন্তব্যে চলে যায়। কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষু লালনকে উদ্ধার করেন মলম শাহ। মলম শাহ ও তার স্ত্রী মতিজান তাকে বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এই সময়ে বসন্ত রোগে তাঁর একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায় এবং মুখমণ্ডলে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এরপর লালন তার কাছে দীক্ষিত হন এবং কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে স্ত্রী ও শিষ্যসহ বসবাস শুরু করেন।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেউড়িয়াতে অবস্থিত লালন সাঁইয়ের আখড়াছেউড়িয়াতে তিনি দার্শনিক গায়ক সিরাজ সাঁইয়ের সাক্ষাতে আসেন এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হন। জনশ্রুতি আছে, পথে সিরাজ সাঁই লালনকে তাঁর নিজের রচিত একটি গানের অর্থ জিজ্ঞাসা করলে লালন তা ব্যাখ্যা করতে পারেননি। তখন সিরাজ সাঁই প্রকৃত অর্থ বুঝিয়ে দেন এবং লালন তাঁকে গুরু হিসেবে বরণ করে নেন।

লালনের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে গবেষকদের মাঝে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, যা তার জীবদ্দশায়ও বিদ্যমান ছিল। তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকার মহাত্মা লালন নিবন্ধে প্রথম লালন জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল বলেছেন, ‘সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম।’ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় লালনের জীবদ্দশায় তাকে কোনো ধরনের ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করতেও দেখা যায়নি। লালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দুধর্ম এবং ইসলামধর্ম উভয় শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। প্রবাসী পত্রিকার নিবন্ধে বলা হয়, লালনের সকল ধর্মের লোকের সাথেই সুসম্পর্ক ছিল। মুসলমানদের সাথে তার সুসম্পর্কের কারণে অনেকে তাকে মুসলমান বলে মনে করতেন। আবার বৈষ্ণবধর্মের আলোচনা করতে দেখে হিন্দুরা তাকে বৈষ্ণব মনে করতেন। প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন মানবতাবাদী এবং তিনি ধর্ম, জাত, কূল, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদি অনুসারে মানুষের ভেদাভেদ বিশ্বাস করতেন না।

লালন মূলত অসাম্প্রদায়িক ও মানবধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়াতে একটি আখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তার শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। তার শিষ্যরা তাকে 'সাঁই' বলে সম্বোধন করতেন। তিনি প্রতি শীতকালে আখড়ায় একটি ভান্ডারা (মহোৎসব) আয়োজন করতেন। যেখানে সহস্রাধিক শিষ্য ও সম্প্রদায়ের লোক একত্রিত হতেন এবং সেখানে সংগীতের পাশাপাশি আলোচনা হত। চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত বাংলার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক লালন ফকিরের শিষ্য ছিলেন; শোনা যায় তার শিষ্যের সংখ্যা প্রায় দশ হাজারের বেশি ছিল। লালনের শিষ্যের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পাঞ্জু শাহ, ভোলাই শাহ, মলম শাহ, শীতল শাহ, মনিরুদ্দিন, যাদের কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কৃতি ও লোকায়ত ধর্মের সম্পর্কে জানেন।

লালনের গানের মূল সুর হলো এই ধ্বংসশীল দেহের ভিত্তিতে অবিনশ্বর ও স্থায়ী ইমারত তৈরি করা। তার সাধনা মূলত জীবনসাধনা, যোগসাধনা তার অন্যতম। এই সাধনার মূলমন্ত্র হলো কঠোর আত্মসংযম—তাই তিনি মানুষকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। লালনের মতে, প্রত্যেক মানুষকে তাদের নিজেদের কথা ভাবতে হবে, নিজেদেরকে জানতে হবে, চিনতে হবে। আত্মউপলব্ধির অভাবে মানুষ একে অপরের প্রতি দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে। কর্তব্যবোধের অভাবজনিত কারণে নিজের কর্ম উপেক্ষা করে পরচর্চায় মগ্ন হয়। এই কারণেই কবি বলেছেন, ‘আপনার আপনিরে মন না জানো ঠিকানা / পরের অন্তর কোটি সমুদ্দর কিসে যায় জানা।’ সাধক ভাবে, নিজের মনকেই যখন জানা যায় না, তখন পরের অন্তরের খবর জানা যাবে কেমন করে?

লালন সাঁইয়ের সমাধিলালনের গানে মানুষ ও তার সমাজই ছিল মুখ্য। লালন বিশ্বাস করতেন সকল মানুষের মাঝে বাস করে এক মনের মানুষ। আর সেই মনের মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় আত্মসাধনার মাধ্যমে। দেহের ভেতরেই মনের মানুষ বা যাকে তিনি অচিন পাখি বলেছেন, তার বাস। সেই অচিন পাখির সন্ধান মেলে পার্থিব দেহ সাধনার ভেতর দিয়ে দেহোত্তর জগতে পৌঁছানোর মাধ্যমে। তার বহু গানে এই মনের মানুষের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন মনের মানুষের কোনো ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ, কূল নেই। মানুষের দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন, কিন্তু শরীরেই মনের বাস। সকল মানুষের মনে ঈশ্বর বাস করেন। লালন, মানব আত্মাকে বিবেচনা করেছেন রহস্যময়, অজানা এবং অস্পৃশ্য এক সত্তা রূপে। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানে তিনি মনের অভ্যন্তরের সত্তাকে তুলনা করেছেন এমন এক পাখির সাথে, যা সহজেই খাঁচারূপী দেহের মাঝে আসা যাওয়া করে কিন্তু তবুও একে বন্দি করে রাখা যায় না।

লালনের সময়কালে যাবতীয় নিপীড়ন, মানুষের প্রতিবাদহীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি-কুসংস্কার, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা সেদিনের সমাজ ও সমাজ বিকাশের সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমাজের নানান কুসংস্কারকে তিনি তার গানের মাধ্যমে করেছেন প্রশ্নবিদ্ধ। আর সে কারণেই লালনের সেই সংগ্রামে বহু শিষ্ট ভূস্বামী, ঐতিহাসিক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, লেখক এমনকি গ্রামের নিরক্ষর সাধারণ মানুষও আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তিনি প্রায় দুই হাজার গান লিখেছিলেন। তার সহজ-সরল শব্দময় এই গানে মানবজীবনের রহস্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। লালনের বেশ কিছু রচনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি ধর্ম-গোত্র-বর্ণ-সম্প্রদায় সম্পর্কে অতীব সংবেদনশীল ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে যখন হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে জাতিগত বিভেদ-সংঘাত বাড়ছিল তখন লালন ছিলেন এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।

লালনের লেখালেখির জার্নিটা আকর্ষণীয়। তাঁর কোনো পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি; শিষ্যরা মুখে মুখে ধারণ করেছেন, পরে সংকলিত হয়েছে। লালন মুখে মুখে গান রচনা করতেন এবং সুর করে পরিবেশন করতেন। এ ভাবেই তার বিশাল গান রচনার ভাণ্ডার গড়ে ওঠে। তিনি সহস্রাধিক গান লিখেছেন বলে ধারণা করা হয়। তবে তিনি নিজে তা লিপিবদ্ধ করেননি। তার শিষ্যরা গান গেয়ে গেয়ে মনে রাখতো আর পরে লিপিকাররা তা লিপিবদ্ধ করেছেন। লালনের চর্চার প্রথম যুগে তাঁর গান সূধী সমাজে পৌঁছায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। রবীন্দ্রনাথ লালনের মৃত্যুর দুই বছর পর তাঁর আখড়াবাড়িতে যান এবং লালনের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে ১৫০ এর বেশি গীত রচনা করেন। তিনি আখড়া থেকে ২৯৮টি গান কপি করিয়ে নেন এবং প্রবাসীতে ২০টি গান প্রকাশ করেন। প্রবাসীর হারামণি বিভাগে ১৩২২ সালের আষাঢ় সংখ্যায় দুটি লালনগীতি প্রকাশিত হয়— এটাই লালনগীতি সংগ্রহের প্রথম সূচনা। এরপর রবীন্দ্রনাথ নানা প্রবন্ধ ও বক্তৃতায় লালনের তত্ত্ব-দর্শন আলোচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের হাতেই লালনের দর্শন, সঙ্গীত-সাধনা ও মানব-চিন্তা সূধী সমাজে মর্যাদা পায়।

লালন সাঁইয়ের শিষ্যদের সমাধিলালন-চর্চার ধারায় বসন্তকুমার পালের ‘মহাত্মা লালন ফকির’ (১৩৬২) ছিল লালন সম্পর্কে প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন ও উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের অবদানও অসামান্য। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার—যিনি ‘কাঙাল ফকিরচাঁদ’ ছদ্মনামে লালনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন—গ্রামবার্তা প্রকাশিকায় লালনের গান ও জীবনকথা সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কলকাতার কুমারখালী-নিবাসী ভোলানাথ মজুমদার ঐ অঞ্চলে সর্বপ্রথম লালনের গান সংগ্রহ করেন এবং লালনের সম্বন্ধে কয়েকটি প্রবন্ধও দুই-একটি সভায় পাঠ করেন। ‘হারামণি’র বিভিন্ন খণ্ডে লালন সঙ্গীত স্থান পায়—তৃতীয় খণ্ডে শতাধিক লালন সঙ্গীত, পঞ্চম খণ্ডে লালন ও পাগলা কানাইয়ের গান, ষষ্ঠ খণ্ডে কলীমূল্লাহর কাছ থেকে সংগৃহীত ছ’শ গান সঙ্কলিত হয়। ড. মতিলাল দাস মহাপন্ন লালনের আত্মার পুরাতন খাতা থেকে ৩৭১টি গান নকল করিয়েছিলেন। ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বাউলদের নিকট থেকে আরও কিছু নতুন গান সংগ্রহ করে ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’-এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

লালনের প্রভাব কেবল বাংলা অঞ্চলের সীমায় সীমাবদ্ধ ছিলো না। কাজী নজরুল ইসলাম, আমেরিকান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ— লালনের দর্শনে প্রভাবিত হয়েছেন। বিবিসি বাংলার জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিদের তালিকায় লালন ১২তম স্থান অর্জন করেন। গান্ধীরও ২৫ বছর আগে, ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম, তাকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দেয়া হয়েছিল। লালনের মৃত্যুর ১২ দিন পর তৎকালীন পাক্ষিক পত্রিকা মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত হিতকরী-তে প্রকাশিত একটি রচনায় সর্বপ্রথম তাঁকে ‘মহাত্মা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত লালন (২০০৪) চলচ্চিত্রে লালনের চরিত্রে রাইসুল ইসলাম আসাদ

লালন স্মরণে রচিত হয়েছে নাটক, উপন্যাস, কবিতা—আসকার ইবনে শাইখের ‘লালন ফকির’, পরেশ ভট্টাচার্যের ‘বাউল রাজার প্রেম’, শওকত ওসমানের ‘দুই মুসাফির’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মনের মানুষ’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উপন্যাস ‘গোরা’ শুরু হয়েছে লালনের গান ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ দিয়ে। সাইমন জাকারিয়া লিখেছেন ‘উত্তরলালনচরিত’ শীর্ষক নাটক। ১৯৭২ সালে সৈয়দ হাসান ইমাম পরিচালনা করেন ‘লালন ফকির’ চলচ্চিত্রটি। তানভীর মোকাম্মেল ১৯৯৬ সালে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্র ‘অচিন পাখি’। ২০০৪ সালে তানভির মোকাম্মেলের পরিচালনায় ‘লালন’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। ২০১০ সালে গৌতম ঘোষ ‘মনের মানুষ’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা ৪১তম ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করে।

প্রতি বছর লালনের তিরোধান দিবসে ছেউড়িয়া আখড়াবাড়িতে লালন স্মরণোৎসব ও সাধুমেলা আয়োজিত হয়, যেখানে দেশ-বিদেশের বাউল ও ভক্তরা সমবেত হন। ২০১০ সাল থেকে এখানে পাঁচ দিনব্যাপী উৎসব হচ্ছে। লালনের গান লালনগীতি বা লালন সংগীত হিসেবে পরিচিত। শ্রোতার পছন্দ অনুসারে বিবিসি বাংলার করা সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ গানটির অবস্থান ছিল ১৪তম। ফরিদা পারভীন উপমহাদেশের সেরা লালন সঙ্গীত শিল্পীদের একজন হিসেবে জীবদ্দশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। লালনের গানের কথা, সুর ও দর্শনকে বিভিন্ন গবেষক বিভিন্নভাবে উল্লেখ করেছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লালন গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী ‘সমাজ সমকাল ও লালন সাঁই’ গ্রন্থটি লিখে নিজেকে উঁচুদরের লালন গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রে লালনের চরিত্রে প্রসেনজিৎ ও বিশাখাসাম্প্রদায়িক ধর্মবাদীরা লালনের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তার সর্বাধিক সমালোচনা করে থাকে। লালন তার জীবদ্দশায় নিজের ধর্ম পরিচয় কারও কাছে প্রকাশ করেন নি। তার ধর্মবিশ্বাস আজও একটি বিতর্কিত বিষয়। লালনের অসাম্প্রদায়িকতা, লিঙ্গ বৈষম্যের বিরোধিতা ইত্যাদির কারণে তাকে তার জীবদ্দশায় ধর্মান্ধ এবং মৌলবাদী হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের ঘৃণা, বঞ্চনা এবং আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। এছাড়া তার ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী দর্শন এবং ঈশ্বর, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে তার উত্থাপিত নানান প্রশ্নের কারণে অনেক ধর্মবাদী তাকে নাস্তিক হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন।

লালনের নিজের ভাষায়, তার দর্শনের মূল কথা: মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ ছাড়া কোনো ধর্ম নাই। আজ জন্মদিনে লালনকে স্মরণ করা মানে নিজের ভেতরের সেই প্রশ্নটিকে জাগিয়ে তোলা: আমি মানুষ, তবু আমার পরিচয় কে লেখে? যে মানুষ একবার লালনের গান শোনেন, তিনি আর আগের মানুষ থাকেন না; তিনি শুনতে শেখেন—জাত কোথায়, মানুষ কোথায়, আর সেই সুরের ভেতর তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন!

এই রচনা পাঠ শেষ করে আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, জানান মন্তব্যে।

লালন সাঁইবাউল গানসাধকদার্শনিকশিমুল সালাহ্উদ্দিন
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    মাধবপুরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে জখম

    মাধবপুরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে জখম

    চা বাগানের কুঁড়েঘর থেকে হার্ভার্ডে

    চা বাগানের কুঁড়েঘর থেকে হার্ভার্ডে

    চেক ডিজঅনার মামলায় মোহনগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার

    চেক ডিজঅনার মামলায় মোহনগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার

    দেশের সব হাসপাতাল লাইব্রেরিতে রাখতে হবে জিয়া-খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখা তিন বই

    দেশের সব হাসপাতাল লাইব্রেরিতে রাখতে হবে জিয়া-খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখা তিন বই

    ভারত থেকে আসছে ১৮ রেলওয়ে কোচ

    ভারত থেকে আসছে ১৮ রেলওয়ে কোচ

    মাছ চুরির অপবাদে সাতক্ষীরায় মৎস্যজীবীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

    মাছ চুরির অপবাদে সাতক্ষীরায় মৎস্যজীবীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

    যুব উন্নয়নের প্রশ্ন ফাঁস : গ্রেপ্তার ৭ জনের ৫ জনই সরকারি চাকরিজীবী

    যুব উন্নয়নের প্রশ্ন ফাঁস : গ্রেপ্তার ৭ জনের ৫ জনই সরকারি চাকরিজীবী

    ঔষধি গাছে আয় ও আয়ু : ১৬ গ্রামের ১০ হাজার মানুষের ভাগ্যবদল

    ঔষধি গাছে আয় ও আয়ু : ১৬ গ্রামের ১০ হাজার মানুষের ভাগ্যবদল

    মোটরসাইকেলের সামনেও রাখতে হবে নম্বর প্লেট, নইলে আইনানুগ ব্যবস্থা

    মোটরসাইকেলের সামনেও রাখতে হবে নম্বর প্লেট, নইলে আইনানুগ ব্যবস্থা

    সারের ডিলারশিপ না দেন, বিষের ডিলারশিপ দেন: ছাত্রদল নেতা

    সারের ডিলারশিপ না দেন, বিষের ডিলারশিপ দেন: ছাত্রদল নেতা

    জুমার নামাজের পর বিশ্বনাথে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ১৫

    জুমার নামাজের পর বিশ্বনাথে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ১৫

    মেঘনা উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক কিরন, সদস্য সচিব নাদিমুজ্জামান

    মেঘনা উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক কিরন, সদস্য সচিব নাদিমুজ্জামান

    তেল যেদিন হয়ে উঠল বিশ্বরাজনীতির অস্ত্র

    তেল যেদিন হয়ে উঠল বিশ্বরাজনীতির অস্ত্র

    আটক দুই পুলিশ সদস্যকে ১৫ ঘণ্টা পর ফেরত দিল বিএসএফ

    আটক দুই পুলিশ সদস্যকে ১৫ ঘণ্টা পর ফেরত দিল বিএসএফ

    আখাউড়ায় বৃদ্ধ ভিক্ষুককে ধর্ষণের অভিযোগ

    আখাউড়ায় বৃদ্ধ ভিক্ষুককে ধর্ষণের অভিযোগ