যোগেন চৌধুরী : বিদায় মাস্টার অব আনব্রোকেন লাইন

যোগেন চৌধুরী (১৯৩৯–২০২৬)
ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার অন্যতম স্তম্ভ ও ‘রেখার জাদুকর’ হিসেবে খ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী মারা গেছেন। আজ রবিবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘ ১৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি ব্লাড ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন; সম্প্রতি মূত্রনালির সংক্রমণ ও সেপসিসের জেরে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হলো না।
যোগেন চৌধুরীর জীবন ও শিল্প এক অবিচ্ছেদ্য সূত্রে গাঁথা। দেশভাগের ক্ষত, উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা এবং সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা—এই সবকিছুরই প্রতিফলন ঘটেছে তার অনন্য শিল্পশৈলীতে। তার প্রয়াণে বাঙালি কেবল একজন শিল্পীকেই হারালাম না, হারালাম এমন এক দার্শনিককেও, যিনি তার তুলির প্রতিটি আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন মানবিক আবেগ ও সামাজিক বাস্তবতার নির্যাস।
শিকড়ের সন্ধানে ফরিদপুর থেকে কলকাতা
যোগেন চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার দহরপাড়া গ্রামে। তার পিতা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন ফরিদপুরের জমিদার। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ১৯৫০ সালে তার পরিবার বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে যায়। এই দেশত্যাগ এবং উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা তার শিল্পী-মনের গভীরে গেঁথে যায়, যা পরবর্তীতে তার বহু শিল্পকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে। কলকাতার কাকার কোয়ার্টারের দেওয়াল থেকেই শুরু হয়েছিল তার আঁকার হাতেখড়ি। ১৯৫৫ সালে তিনি কলকাতার সরকারি আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৬০ সালে সেখান থেকে চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি প্রথমে হাওড়ার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন এবং পরে হ্যান্ডলুম বোর্ডে কাজ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি চেন্নাইয়ে (সে সময়ের মাদ্রাজ) টেক্সটাইল ডিজাইনার হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিনি প্যারিসে যান এবং সেখানকার বিখ্যাত ‘ইকোল নাসিওনাল সুপেরিয়র দে বো আর্টস’-এ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। প্যারিসে তিনি বিখ্যাত শিল্পী উইলিয়াম হেইটারের ‘অ্যাটেলিয়ার ১৭’-এও অঙ্কনের পাঠ নেন। ইউরোপে অবস্থানকালে তিনি ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, মিশরসহ বিভিন্ন দেশের জাদুঘর ও গ্যালারি পরিদর্শন করে নিজের শিল্পভাবনাকে শাণিত করেন।
শিল্পের জগতে পদার্পণ ও নিজস্ব ভাষার সন্ধান
দেশে ফিরে এসে যোগেন চৌধুরী দিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটর হিসেবে দীর্ঘ ১৫ বছর (১৯৭২–১৯৮৭) দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীদের কাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। এরপর তিনি শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং দীর্ঘ ২৮ বছর শিক্ষকতা করেন; তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন অধ্যাপক এমেরিটাসও ছিলেন। তার শিল্পীজীবনে একটি বড় মোড় আসে ৭০-এর দশকে, যখন তিনি ‘কলকাতা পেইন্টার্স’ গোষ্ঠীতে যোগ দেন।
যোগেন চৌধুরী তার শিল্পকর্মে মূলত প্যাস্টেল, জলরং, কালি এবং কখনও কখনও তেলরঙ ব্যবহার করতেন। কিন্তু তার শিল্পের প্রাণ ছিল ‘রেখা’। শিল্প সমালোচকরা তাকে ‘আনব্রোকেন লাইন’-এর মাস্টার হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার আঁকা মানবদেহের বক্ররেখা, বিশেষত নারীদেহের নানা ভঙ্গিমা, একদিকে যেমন শারীরিক সৌন্দর্যের প্রকাশ, তেমনই অন্যদিকে মানবিক আবেগ ও যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। তার ছবিতে আড়াআড়ি রেখার জাল ছিল বিশেষত্ব; এই ‘ক্রস-হ্যাচিং’ কৌশলের মাধ্যমে তিনি রেখার সাহায্যেই আলো-আঁধারের খেলা, বস্তুর আয়তন এবং টেক্সচার ফুটিয়ে তুলতেন।
শিল্পের ভাষা: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
যোগেন চৌধুরীর শিল্পকর্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্পভাবনার অনন্য মেলবন্ধন। তাকে বলা হয় এমন একজন শিল্পী, যিনি ঐতিহ্যবাহী ভাবমূর্তিকে সমকালীন চিত্রকলার চেতনার সঙ্গে সফলভাবে বিবাহ দিয়েছেন। তিনি বাংলার লোকশিল্প, পটচিত্র, টেরাকোটা রিলিফ এবং উপজাতীয় শিল্পের প্রেরণা নিয়ে তা তুলেছিলেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। তিনি নিজেই বলেছেন, “আমি বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প—যেমন পটচিত্র এবং টেরাকোটা ভাস্কর্য—খুব পছন্দ করি। এই প্রভাবগুলো স্বাভাবিকভাবেই আমার কাজে প্রবেশ করেছে”।
তার ছবিতে ফুটে উঠেছে সমাজের প্রান্তিক মানুষ, উদ্বাস্তু, সাধারণ নারী-পুরুষ এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামের কথা। দেশভাগের ক্ষত, মানুষের ভাঙাচোরা মুখ, শরীরের বিকৃতি—সবই হয়ে উঠেছিল তার তুলির ভাষা। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পীর কাজ কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টি করা নয়, বরং সমাজের অসঙ্গতি ও যন্ত্রণার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তার ছবিতে গণেশ, দম্পতি এবং নারী ছিল প্রিয় বিষয়। শিল্প সমালোচকদের মতে, তার কাজে একটি ‘অর্গানিক’ গতি আছে—তিনি কখনও দ্রুতরেখা ব্যবহার করেন না, অথচ তার লাইনগুলোর মধ্যে একটি অন্তর্গত, মন্থর অথচ নিশ্চিত প্রবাহ থাকে।
সম্মাননা ও রাজনৈতিক জীবন
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য যোগেন চৌধুরী বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের ‘প্রি লে ফ্রান্স দে লা জিউন পেইনচার’, ১৯৮৬ সালে কিউবার হাভানা বিয়েনালে পুরস্কার, ২০০১ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকারের ‘কালিদাস সম্মান’, ২০০৪ সালে ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ এবং ২০১৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’। এছাড়াও তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বঙ্গবিভূষণ’ (২০১২) এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ‘ডি.লিট’ উপাধি লাভ করেন।
শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক জীবনেও সক্রিয় ছিলেন। ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য (এমপি) ছিলেন। সমাজসচেতন এই শিল্পী সংসদে বক্তৃতা দেওয়ার সময়ও শিল্প ও সংস্কৃতির গুরুত্বের কথা তুলে ধরতেন এবং শিল্পকলার জন্য আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধির দাবি জানাতেন।
শেষের বাঁশি
ব্যক্তিগত জীবনে যোগেন চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত সরল, সহজ এবং দিলখোলা মানুষ। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ছিল। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তার প্রয়াণে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন, “খুবই দুঃখের খবর, বিশেষ করে আমার কাছে। যোগেন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। খুবই কাছের বন্ধু।... খুব সহজ, সরল, দিলখোলা একটা মানুষ ছিল যোগেন। ওর হাসিটা এখনও ভুলতে পারছি না”। তিনি আরও জানান, শেষের দিকে যোগেন চৌধুরী নিজেকে বাড়িতে বন্দি করে রেখেছিলেন, কারও সঙ্গে মেলামেশা করতেন না, এমনকি টেলিফোনও ধরতেন না। কলকাতার ‘কারুবাসনা’ নামে তার ছোট্ট স্টুডিওটি ছিল তার সৃষ্টিকর্মের অন্যতম কেন্দ্র।
উত্তরাধিকার
যোগেন চৌধুরীর মৃত্যুতে ভারতের শিল্প জগৎ এক অভূতপূর্ব শোকের মধ্যে ডুবে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে দেশের প্রখ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা তার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। চিত্রশিল্পী সমীর আইচ বলেছেন, এটি “বাংলার অপরিসীম ক্ষতি”। তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার আগে তাকে কলকাতার সাউথ সিটিস্থিত তার বাসভবনে এবং এরপর ২০১৯ সালে তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠিত ‘চারুবাসনা’ মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে তার আজীবনের সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষিত আছে।
যোগেন চৌধুরী কেবল একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক, একজন সমাজকর্মী এবং একজন শিক্ষক। তার শিল্পকর্ম আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের মনকে স্পর্শ করে, কারণ সেখানে ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের কথা। তিনি দেখিয়ে গেছেন, শিল্প কেবল গ্যালারির দেয়ালে ঝুলে থাকার বস্তু নয়, বরং তা সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তার চলে যাওয়ায় বাংলার চিত্রকলার এক স্বর্ণযুগের সমাপ্তি ঘটল, কিন্তু তার রেখা, তার রং এবং তার শিল্পভাবনা আগামী বহু প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখাবে।







