আনু মুহাম্মদ
গণঅভ্যুত্থানের পরও প্রতিষ্ঠিত হয়নি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ

ছবি: আগামীর সময়
গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন হলেও জনগণের প্রত্যাশিত বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন ‘সর্বজন কথা’-এর সম্পাদক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
তার ভাষায়, গণ-অভ্যুত্থান জনগণের শক্তির প্রকাশ ঘটালেও সেই শক্তিকে সংগঠিত ও বিকশিত করার কাজ দুর্বল থাকায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। তাই হতাশ না হয়ে দ্রোহ যাত্রা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে কোটা আন্দোলন ঘিরে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ‘দ্রোহযাত্রা’। ২০২৪ সালের ২ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘শিক্ষার্থী-জনতার দ্রোহ যাত্রা’ কর্মসূচি থেকে হাসিনা সরকারের পদত্যাগের দাবি তুলেছিলেন আনু মুহাম্মদ। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি আজ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফায় এসে ঠেকেছে। হাসিনা সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে।’
দ্রোহ যাত্রার পরদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম এক দফা ঘোষণা করেন। দ্রোহ যাত্রার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আজ রবিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একই নামে কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
আয়োজকদের ভাষ্য, দ্রোহ যাত্রার আয়োজক কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামে বিশ্বাসী মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। এবারের কর্মসূচি থেকে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—জুলাই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিসহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি বাতিল, জাতিগত, ধর্মীয় ও লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়ন বন্ধ, মতপ্রকাশের অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত, শ্রমিকের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা, বন্ধ কলকারখানা চালু, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু, উন্নয়নের নামে প্রাণ-প্রকৃতি বিনাশী প্রকল্প বন্ধ এবং শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের অধিকারকে জাতীয় নিরাপত্তার আওতায় আনা।
বিকেলে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। এরপর পরিবেশিত হয় ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ ও ‘এই শেকল পরার ছল’ গান। পরে সভাপ্রধানের বক্তব্য দেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
এ সময় আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘দুই বছর আগে ২০২৪ সালে কোন প্রেক্ষাপটে দ্রোহযাত্রা হয়েছিল এবং সেই দ্রোহযাত্রায় সমাজের সব স্তরের মানুষ কীভাবে যুক্ত হয়ে জনগণের একটা সম্মিলিত শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন, সে বিষয়ে আপনারা অবগত আছেন এবং সেভাবেই হাসিনার যে দীর্ঘ অত্যাচারী শাসন, তার অবসান হয়েছিল। সেই অবসানের পরে, সেই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—একটা বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, যেখানে ধর্মীয়, লিঙ্গীয়, শ্রেণিগত, জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্তিগুলো সংগঠিত হবে, রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং বাংলাদেশের নতুন যাত্রা শুরু হবে।’
গণঅভ্যুত্থানের পরও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখলাম, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন হয়েছে কিন্তু গণঅভ্যুত্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এই পরিস্থিতির কারণেই আমরা এই ২০২৬ সালে আবারও দ্রোহ যাত্রায় শামিল হয়েছি। তার মানে গণঅভ্যুত্থান—এটা পরিষ্কারভাবে আমাদের বুঝতে হবে—গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের শক্তির প্রকাশ ঘটেছে, সর্বজনের শক্তির প্রকাশ ঘটেছে কিন্তু সর্বজনের, সর্বপ্রাণের যে উন্নয়ন দর্শন সেটা সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য যে শক্তিগুলো দরকার, সেই শক্তিগুলোকে সংগঠিত করা, সেই আদর্শকে সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করার কাজ যদি দুর্বল থাকে, তাহলে গণঅভ্যুত্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারে না। সেই প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে গেলে সেই কাজগুলো আমাদের অনেক বাড়াতে হবে।’
হতাশা না ছড়িয়ে গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সেই কারণে যারা হতাশা ছড়াচ্ছেন, যারা বিভিন্নভাবে হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি করেছেন, তাদের উদ্দেশে আজকের দ্রোহ যাত্রায় আমাদের বক্তব্য যে, হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। হতাশা যারা ছড়ায়, সেই হতাশা ছড়ানো যাবে না। গণঅভ্যুত্থানের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে সেই শক্তিকে সম্প্রসারিত করতে হবে।’
দ্রোহ যাত্রার লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের যাত্রা একটা যথাযথ জায়গায় না যাবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের সেই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে প্রকাশিত জনগণের শক্তি, সর্বজনের শক্তি—সেটাকে আরও সংগঠিত করতে হবে, বিকশিত করতে হবে এবং আমাদের দ্রোহ যাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিসহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি বাতিল, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং শ্রমজীবীসহ সব পর্যায়ের মানুষের যে গণতান্ত্রিক অধিকার, সেই প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরও উচ্চকিতভাবে প্রকাশ করে আজকের এই দ্রোহ যাত্রার আয়োজন।’
এবারের দ্রোহ যাত্রায় গান, কবিতা ও নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেয় কোরাস, সায়ান, দ্য কমরেডস, বিবর্তন, উদীচী, মাভৈ, কফিল আহমেদ এবং সমগীতের শিল্পীরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন— অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, কবি মোহন রায়হান, জামসেদ আনোয়ার তপন, আরিফ নূর, রহমান মফিজসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্ব।









