ফরহাদ মজহার
রাজনৈতিক ন্যারেটিভ কীভাবে মানুষকে দীর্ঘদিন গোলাম করে রাখে, ভাবা উচিত

ফরহাদ মজহারের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বিশেষ আলোচনা সভা। ছবি: আগামীর সময়
রাজনৈতিক ন্যারেটিভ কীভাবে দীর্ঘদিন মানুষকে পরাধীন করে রাখে, তা নিয়ে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন কবি, চিন্তক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক ন্যারেটিভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন না হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ফরহাদ মজহারের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রবিবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত ‘৮০তম জন্মদিনের উছিলায় মুখোমুখি ফরহাদ মজহার’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফান্দিয়ার জাহিদ হাসান অডিটোরিয়ামে বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে এ আয়োজন।
ভারতের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভে বাংলাদেশের অনুপস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এখনও ভারতের ন্যারেটিভে, ভারতের যে ইতিহাসের মধ্যে আপনি অনুপস্থিত। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাতে কোনো মুসলমান চরিত্র নাই। ঋত্বিক ঘটকের কোনো সিনেমাতে মুসলমান চরিত্র নাই। দিল্লির যে ইতিহাস, সেই ইতিহাসে বাংলাদেশ বলে কিছু নাই। ওটা পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘কলকাতার কোনো কবিতা বা সাহিত্যে মুসলমানরা সবসময় অনুপস্থিত।’
রাজনৈতিক ন্যারেটিভের গুরুত্ব তুলে ধরে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘রাজনৈতিক ন্যারেটিভ কিন্তু অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভাবা উচিত যে এই ন্যারেটিভটা কীভাবে আপনাকে গোলাম করে রাখে দীর্ঘকাল।’
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। ‘বাংলাদেশ কম করে হলেও ২০০-৩০০ বছর এগিয়ে আছে পশ্চিম বাংলার চেয়ে। আমরা যা চিন্তা করতে পারি, আমরা যা চিন্তা করতে সক্ষম, ওই চিন্তা করার সক্ষমতা, বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ, বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য, এমনকি রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা পশ্চিম বাংলার চেয়ে, ভারতের চেয়ে অনেক অগ্রসর।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আঞ্চলিক প্রভাব প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানটা যখন হয়েছিল, তখন আমি বলেছিলাম এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা, এটা পুরো উপমহাদেশকে নাড়িয়ে দেবে। পুরো উপমহাদেশকে এটা নাড়িয়ে দিয়েছে ইতোমধ্যে।’
ভবিষ্যতে বুদ্ধিবৃত্তিক ও চেতনাগত চর্চায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আগামী দিনে একটু বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে, চেতনাগত কাজে, পরস্পরকে বোঝাবুঝির কাজে একটু মনোযোগী হই, তাহলে কিন্তু আমরা বড় ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারব। আর যদি উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলি, ইমোশন দিয়ে কথা বলি, অন্যকে ছোট করার জন্য কথা বলি, তাহলে আমরা আগাতে পারব না।’
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক রূপান্তর নিয়েও বক্তব্য দেন ফরহাদ মজহার। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে রোমান্টিসাইজ না করে এর বহুমাত্রিক বাস্তবতা অনুধাবনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে রোমান্টিসাইজ করবেন না ভাই। আমরা বহু বন্ধু হারিয়েছি। এই হারানোটা বা ক্ষতটা অনেক গভীর।’
সামাজিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে পথে আপনি কোনো কিছু অর্জন করেন, সেই পথের রক্তাক্ত স্মৃতি ও দাগ আপনার পুরো ইতিহাসকে পরবর্তীতে বিপদে ফেলে দেয়।’
তাড়াহুড়ো করে বা সহিংস উপায়ে পরিবর্তন আনার পরিবর্তে ধৈর্য ধরে চেতনার রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘সমাজের পরিবর্তনটা চেতনার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ধৈর্য ধারণ করে আগাইতে হবে। তাড়াহুড়ো করতে গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তপাতের ভেতরে ঢুকতে হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কবি ও সংগঠক মোহাম্মদ রোমেল। ফরহাদ মজহারের জীবন ও কর্ম নিয়ে তিনটি পর্বে পারস্পরিক আলোচনা করেন লেখক উদয় হাসান, চলচ্চিত্র নির্মাতা তাসমিয়াহ্ আফরিন মৌ এবং কবি ব্রাত্য রাইসু।





