নড়াইলের সারি গান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সারি গান মূলত একধরনের কর্মসংগীত, সার বেঁধে সম্মিলিতভাবে গাওয়া হয় বলে একে সারি গান বলে। ছাদ পেটানোর সময়, নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায়, ক্ষেতে কাজ করার সময় বা ধান ভানার ক্ষেত্রে সারি গান গাওয়া হয়। সারি গান অনেক সময় আমাদের জীবনবোধের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাস, ধর্মকথার আশ্রয়ে রচিত হয় স্বভাব-কবিদের রচনায়। এ ধরনের একটি সারি গান নড়াইল সদর উপজেলা থেকে সংগৃহীত, বিপিন সরকারের লেখা গানটি এমন—
রাবণের শক্তিশেলে লক্ষ্মণ পৈলো
গাও তোলো রে ও ভাই লক্ষ্মণ রাম কেন্দে মলো।।
ওই ওরে— পিতৃসত্য পালন করতে-আমি এলাম বন
সঙ্গে এলো সীতা সতী অনুজ ভাই লক্ষ্মণ।।
বনবাসে এলাম আমি দেশে মলো পিতা,
পঞ্চবটি বনে এসে হারা হইলাম সীতা,
সীতা গেলে সীতা পাব প্রতি ঘরে ঘরে,
প্রাণের ভাই লক্ষ্মণ হারালে, ভাই বলিবো কারে।।
গাও তোলো গাও তোলো লক্ষ্মণ চলো দেশে নাই,
এ সংসারে মিলবে না, না রে তোমার মতো ভাই।।
বাংলাদেশের সর্বত্রই সারি গান অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমাদের লোকসাহিত্যের সারি গানে সাধারণত
আধ্যাত্মিক, বীরত্বব্যঞ্জক, হালকা প্রেমমূলক বিষয় সন্নিবিষ্ট হয়। এমন কিছু তথ্য আছে,
যা সাহিত্যিক, সামাজিক এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে মূল্যবান। কর্মরত অবস্থায় সারি গান সমবেতভাবে
পরিবেশিত হয়ে থাকে। এখানে নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলা থেকে সংগৃহীত একটি গান উদ্ধৃত
করছি:
জয় বাংলা বলিয়া আমরা গেয়ে যাব দেশের গান
হারে আমরা বাংলা মায়েরই সন্তান।।
ওরে বাংালাদেশের নদী করে সাগরের সন্ধান
হাল ধরে পাল তুলে মাঝি গাহে সারিগান রে।।
ওরে বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে ফলে সোনার ধান
আমাদেরি খাটনির ফসল, বিশ্বপতির দান রে।।
ওরে বিশ্বকবি সোনার বাংলা রেখেছিল নাম
কবি নজরুল গেয়ে গেল বাংলার জয়গান রে।।
হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান এক মায়ের সন্তান
বাংলা মায়ের গুণে মোদের নাই কো অভিমান রে।।
অসীম বলে বাংলা মায়ের চরণে জানাই
চির নির্বাণ হলে মাগো বক্ষে দিও ঠাঁই রে।।
নড়াইল জেলায় একসময় প্রচুর সারি গান শোনা যেত। যার সুর টানাটানা ও চড়া এবং খুব জমাট। নৌকা চালানোর সময়, ছাদ পেটানোর সময়, ধান বা পাট কাটার সময় সমবেত কণ্ঠে যে গান গাওয়া হয়, তাকে সারি গান বলা হয়। সারি গানের সঙ্গে শ্রমজনিত কোনো কাজের যোগ থাকে। নদীমাতৃক নড়াইলে মাঝিমাল্লারা এ গান বেশি গেয়ে থাকেন। এই গান সাধারণত নৌকাবাইচ, শব্দ তানের পর নৃত্যসহকারে গেয়ে থাকে। লোহাগড়া উপজেলার দীঘলিয়া ইউনিয়নের আকরাবাড়ি গ্রামের সন্তোষ বিশ্বাসের একটি সারি গানের দল এখনো বিদ্যমান। আশ্বিন মাসে বিলে কাজ করার সময়, দুর্গাপূজা এবং বড়দিয়ার নবগঙ্গা ও নড়াইলের চিত্রা নদীতে নৌকাবাইচের সময় সারি গান গেয়ে থাকে। এখানে তা উদ্ধৃত করছি :
সোনার কমল ভাসিয়ে কে রে জলেতে দিলো
আমার মা বুঝি কৈলাসে চলিলো
ঐ ওরে কালীঘাটের কালী মাগো, কৈলাসে ভবানী,
বৃন্দাবনে রাধে তুমি গোকুলে গোপিনী
যাত্রাকালে সঙ্গে আমার এসেছিলো গুণের ভাই,
ওরে লক্ষ্মণ গা তোলো দেশে যাই।।
বনে মলো বনরাজি, দেশে মলো পিতা
গুণের ভাই ছেড়ে হারা হলাম সীতা।
ওরে লক্ষ্মণ গা তোলো দেশে যাই।।
সীতা গেলে সীতা পাব প্রতি ঘরে ঘরে
গুণের ভাই লক্ষ্মণ হারালে ভাই বলিবো কারে।
ওরে লক্ষ্মণ গা তোল দেশে যাই
যে কালেতে আইলাম বনে, সীতা ছিলো ছোট
দিনে দিনে বাড়ে সীতা বাকল হলো খাটো।
ওরে লক্ষ্মণ গা তোল দেশে যাই।
নড়াইলের সারি গান বাংলার লোকসাহিত্যে এক বিপুল ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে আছে, যা লোকায়ত বাংলার চিরায়ত সম্পদ।



