স্মরণে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম
আমাদের স্থাপত্যকলার অগ্রদূত

মাজহারুল ইসলাম (২৫ ডিসেম্বর ১৯২৩ – ১৪ জুলাই ২০১২)। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাজহারুল ইসলাম নামটি উচ্চারিত হলেই এক নীরব অথচ দৃপ্ত প্রত্যয়ের ছবি ভেসে ওঠে। তিনি শুধু স্থপতি ছিলেন না; ছিলেন একাধারে শিক্ষক, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সর্বোপরি এক দার্শনিক, যিনি ইট-কাঠ-পাথরের শরীরে প্রাণ দিয়ে বুনে দিয়েছিলেন বাংলার জল-হাওয়া-মাটির ভাষা।
১৯২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছিলেন আজকের বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রথম প্রশিক্ষিত স্থপতি। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটিতে বেড়ে ওঠা এই কিশোর পরবর্তী জীবনে প্রায় একক হাতেই এ দেশে আধুনিক স্থাপত্যের সূচনা ও বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরকৌশলে স্নাতক শেষ করে বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন আমেরিকায়। ১৯৫২ সালে ইউনিভার্সিটি অব ওরেগন থেকে স্থাপত্যে স্নাতক হয়ে পরে যোগ দেন লন্ডনের বিখ্যাত স্কুল অব আর্কিটেকচারে, আর প্রখ্যাত স্থপতি পল রুডল্ফের তত্ত্বাবধানে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করেন স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন।
রবীন্দ্রনাথের আলোকিত বিশ্বচেতনা আর কার্ল মার্ক্সের সাম্যভাবনা— দুটোই তৈরি করেছিল তার চিন্তার জমিন। তিনি বলতেন, ‘তোমাকে একাধারে হতে হবে বাঙালি ও বিশ্বমানব, অন্যথায় নতুন কিছু সম্ভব নয়।’ এই বোধ থেকেই আজীবন তিনি সাদাসিধে, নিরহংকার আর নিরলংকার জীবন কাটিয়েছেন; যারা দেখেছেন তাকে কেউ কখনো আড়ম্বর করতে অন্তত দেখেননি কোনো বিষয় নিয়ে।
মাজহারুল ইসলামের হাত ধরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি স্থাপনা যেন একেকটি নীরব কবিতা, বিশেষভাবে চোখে পড়বেই দর্শকের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ভবন, পাবলিক লাইব্রেরি, শেরেবাংলা নগরের জাতীয় আর্কাইভস ও জাতীয় গ্রন্থাগার, আজিমপুরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আবাসন, জীবনবীমা ভবন, দেশের পাঁচটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাপরিকল্পনা ও নকশা, বিশ্বব্যাংকের অফিস ভবন— সবই তার সৃষ্টির বিস্তৃত প্রমাণ।
পঞ্চাশের দশকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত প্রতিটি কাজেই তিনি খুঁজেছেন বাংলার জলবায়ু, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে স্থাপত্যের এক ‘নিবিড় জৈব সম্পর্ক’। বিশেষ করে চারুকলা ভবনটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আধুনিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে আদুল ইটের লাল গায়ে তিনি মেখে রেখেছেন এ দেশের গৃহস্থ ঘরের উষ্ণতা, খোলা ছাদে টব-গাছের সমারোহে মিলিয়ে দিয়েছেন ভবনের শরীরটাকে প্রকৃতির সঙ্গে। আর ১৯৬৭ সালে প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে গড়া নিজস্ব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘বাস্তুকলাবিদ’ থেকে করা কাজগুলোতে তিনি প্যাভিলিয়ন, আঙিনা আর বাতাস চলাচলের উপযোগী ছিদ্রায়িত দেয়ালের মৌলিক ধরনকে বারবার পরিশীলিত করে তুলেছেন।
মাজহারুল ইসলাম শুধু ইমারত গড়েননি; তিনি গড়েছিলেন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। যে দৃষ্টিতে সভ্যতা আর প্রকৃতি মুখোমুখি নয়, বরং হাতে হাত রেখে দাঁড়ায়; যে দৃষ্টিতে ইটের রঙ হয়ে ওঠে বাংলার মাটিরই প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের স্থাপত্যে তার সবচেয়ে বড় অবদান, তিনি এ দেশের স্থাপত্যকে ঔপনিবেশিক নকশার অনুকরণ থেকে মুক্ত করে একটি নিজস্ব ভাষা দিয়েছেন। তার দর্শন ছিল স্পষ্ট- ‘আধুনিক হওয়া মানে নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। বরং নিজ সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে, জলবায়ু ও ভূগোলকে মেনে সমসাময়িক চাহিদার উত্তর দেওয়াই হলো খাঁটি আধুনিকতা।’
এই ভাবনা থেকেই তিনি ইট, কংক্রিট, কাচ আর কাঠের মৌলিক উপকরণগুলো কোনো প্রলেপ ছাড়াই প্রকাশ করেছেন— কাঠামো নিজেই যেন হয়ে ওঠে অলংকার। তার স্থাপত্যে আলো-বাতাসের হিসাব-নিকাশ ছিল নিখুঁত। তিনি বুঝেছিলেন, এই বদ্বীপের গরম-আর্দ্র আবহাওয়ায় টিকে থাকতে হলে ভবনের শরীরে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল, ছায়া আর আঙিনার অবাধ বিস্তার। তাই তিনি গ্রামবাংলার উঠোন আর চালাঘরের নির্যাসকে নিয়ে এলেন ইট-পাথরের জ্যামিতিক কাঠামোয়। চট্টগ্রামের ঢেউখেলানো টিলায় বা জাহাঙ্গীরনগরের সবুজ প্রান্তরে ভবনের অবস্থান, বাতাসের গতিপথ আর সূর্যের অবস্থান হিসেবেই তিনি দালানের গ্রিড ঘুরিয়ে দিয়েছেন, তৈরি করেছেন কৌণিক পথ আর চমৎকার সব সোপান।
শুধু নিজের কাজেই থেমে থাকেননি; ১৯৬০-এর দশকে সাহসী উদ্যোগ নিয়ে লুই আই কানকে আমন্ত্রণ জানিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের মতো মহাকাব্যিক স্থাপনার পথ তৈরি করে দেন, পাশাপাশি আমেরিকান স্থপতি স্ট্যানলি টাইগারম্যান ও পল রুডল্ফকেও এ দেশের মাটিতে কাজ করান। তার হাত ধরেই জলবায়ু-সংবেদনশীল, স্থানীয় উপকরণে গড়া আধুনিক স্থাপত্যের যে ধারা শুরু হয়, তা-ই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের স্থাপত্য আন্দোলনের মূল স্রোত।
তার কাজের গভীরতা উপলব্ধি করেছিল বিশ্বমহলও। ১৯৮০ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত প্রথম আগা খান স্থাপত্য পুরস্কারের মাস্টার জুরির সদস্য হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেখান থেকেই জেদ্দায় ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও রিয়াদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভবনের নকশা প্রতিযোগিতার মতো বহু আন্তর্জাতিক জুরিবোর্ডে তার উপস্থিতি হয়ে ওঠে অপরিহার্য। ১৯৯৯ সালে টেক্সাসে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের জাতীয় সম্মেলনে তাকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ দেওয়া হয়। একই বছর বাংলাদেশ সরকার তাকে ভূষিত করে স্বাধীনতা পুরস্কারে।
মাজহারুল ইসলামের জীবন ও কাজ যে শুধুই অতীতের সম্পদ নয়, বরং আগামীর পথচলারও এক উজ্জ্বল দিশারী, তা বোঝা যায় পরবর্তী প্রজন্মের ওপর তার রেখে যাওয়া প্রভাব দেখে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি যেমন তরুণ স্থপতিদের সরাসরি কাজ শিখিয়েছেন— তার ছাত্র ও সহকর্মী স্থপতি শামসুল ওয়ারেস যেমন বলেছিলেন, ‘উনি কখনো কোনো কিছুর সঙ্গে আপস করতেন না, দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের কাজ করতেন’— তেমনি জ্ঞানচর্চার এক প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মও গড়ে দিয়েছিলেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাড়না নিজেকেই জাগাতে হবে; তাই ছেলে রফিক মাজহার ইসলামকে ছোটবেলায় বলতেন, ‘সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেওয়া যায় না, পড়লে তবে নিজেই জানতে পারবে।’ এই শিক্ষাদর্শন থেকেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘চেতনা স্টাডি গ্রুপ’, যা পরে ‘চেতনা সোসাইটি’ নামে বাংলাদেশের স্থাপত্যচিন্তায় এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখে। এই চক্রটি তরুণ স্থপতিদের শুধু আধুনিকতার রূপ-রীতি নিয়ে প্রশ্ন করতেই শেখায়নি, বরং বাংলার চিরায়ত স্থাপত্য-ঐতিহ্যের যে অন্তর্নিহিত নীতি ও আদর্শ— যেমন জলবায়ুর প্রতি সহজাত সাড়া, উঠোন বা আঙিনার ব্যবহার এবং সহজ দেশীয় প্রযুক্তির আত্মনির্ভরশীলতা— সেসব চিনিয়ে দিয়েছে।
ফলে আজকের স্থপতিরা যে টেকসই, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের কথা ভাবেন, তার বীজ মাজহারুল ইসলাম বুনেছিলেন ৬ দশক আগেই। তার দেখানো পথ ধরে আমরা এখনো শিখি, কীভাবে ইটের গাঁথুনি হতে পারে প্রশ্বাস নেওয়া পোশাকের মতো কোমল, আর কীভাবে একটি আধুনিক ভবনও হয়ে উঠতে পারে নদীমাতৃক দেশেরই অনিবার্য অংশ।
মাজহারুল ইসলাম শুধু ইমারত গড়েননি; তিনি গড়েছিলেন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। যে দৃষ্টিতে সভ্যতা আর প্রকৃতি মুখোমুখি নয়, বরং হাতে হাত রেখে দাঁড়ায়; যে দৃষ্টিতে ইটের রঙ হয়ে ওঠে বাংলার মাটিরই প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস, ভূগোল, সমাজ আর নিরন্তর নান্দনিকতার এই যে অনন্য মিশেল, তা-ই তাকে চিরকালের জন্য স্থাপত্যের নীরব এক কবি হিসেবে অমর করে রাখবে।
এই লিংকে দেখুন স্থপতি লেখক নির্মাতা এনামুল করিম নির্ঝরের মাজহারুল ইসলামকে নিয়ে বানানো তথ্যচিত্র









