মানবতাবিরোধী অপরাধ
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ২ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন

ফাইল ছবি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দুই জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিনি ছিলেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দায়ের হওয়া এ মামলায় তিন আসামিকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ বাচ্চুসহ ২৫ জনকে।
আজ বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন- রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি)-এর সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
রায় ঘোষণার সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুইজনসহ আটক ছয়জন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন আরপিএমপির সাবেক সহকারী কমিশনার আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম নয়ন, এবং রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ক্যাম্পের সাবেক ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতি ভূষণ রায় মাধব।
পাশাপাশি দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুন্যাল অ্যাক্ট ১৯৭৩-এর অন্য একটি ধারায় এই তিন আসামিকে দেওয়া হয়েছে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডও। আদলত জানায়, তাদের সাজা চলবে যুগপৎভাবে।
এছাড়া এই মামলায় ১০ বছর করে কারাদণ্ড পেয়েছেন আরো পাঁচ আসামি। এরা হলেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল আসাদ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বেরোবি শাখা সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড পেয়েছেন নয় জন। এরা হলেন- আরপিএমপির সাবেক উপকমিশনার আবু মারুফ হোসেন টিটু, সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী সুমন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান তুফান, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী আকাশ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী মাহাবুবার রহমান বাবু এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ রংপুর শাখার সভাপতি ডা. সারোয়াত হোসেন চন্দন।
তিন বছর করে সাজা পেয়েছেন ১০ আসামি। এরা হলেন- বেরোবির সাবকে সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার টগর, দফতর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া এবং এমএলএসএস এ কে এম আমির হোসেন আমু।
এছাড়া আদালত এই মামলার অপর আসামি বেরোবির প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেলকে কয়েকটি ধারায় দোষী সাব্যস্ত করলেও তার হাজত বাসকালীন সময়কে সাজার মেয়াদ গণ্য করে দন্ডাদেশ দিয়েছেন। অন্য কোনো মামলায় প্রয়োজন না হলে তার সাজার মেয়াদ সমাপ্ত হয়েছে বিবেচনায় তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত।
ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ দেন, ‘চব্বিশের গণআন্দোলনের প্রথম শহীদ যিনি তিনি দুই হাত ছড়াইয়া দাঁড়িয়েছিলেন। আশা করেছিলেন- মানুষতো আমার সামনে, মানুষ আমাকে আক্রমণ করবে না। কিন্তু উনার সমনে যে মানুষ ছিলো না, ছিলো অমানুষ, সেটা তিনি বুঝতে পারেন নি।’
রায়ে খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা। তার ভাই আবু হোসেন বলেছেন, ‘আজ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। যে দুইজন গুলি করেছিলো তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যারা গুলি করেছিলো তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে এটা করেছেন। অথচ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে আমাদের অসন্তুষ্টি আছে।’
মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ বাচ্চুসহ ৩০ আসামির বিরুদ্ধে গত বছর ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারিক প্রক্রিয়ায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়।
এই মামলার ৬ জন আসামি গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন- বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক সাবেক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক সহকারি উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা এমরান চৌধুরী আকাশ। বাকিরা পালিয়ে আছেন।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের সেই ভিডিওটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এমএইচ তামীম। অন্যদিকে, বেরোবির তৎকালীন প্রক্টর শরীফুল ইসলামের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটো এবং পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী সুজাদ মিয়া।















