জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি হামলার শুরু হয়নি বিচার
- ঢাকার নিম্ন আদালতে জুলাইয়ের ৩৭ মামলায় অভিযুক্ত ১৩৩০
- ২২ হত্যাসহ ৩১ অভিযোগের সত্যতা মেলেনি
- অভিযুক্তদের চেয়ে তিন গুণ নির্দোষ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যার শিকার হয়েছেন শত শত ছাত্র-জনতা। আহত ও পঙ্গু আরও হাজারো আন্দোলনকারী। এসব ঘটনায় বিচার পেতে রাজধানীর থানায় থানায় হয়েছে আট শতাধিক মামলা। কিন্তু শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছরেও শুরু হয়নি কোনোটির বিচার। এর মধ্যে ৬৮ মামলার তদন্ত শেষ হলেও অভিযোগপত্র দেওয়া গেছে ৩৭টির। আর ৩১টির ক্ষেত্রে প্রমাণ হয়নি অভিযোগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারীসহ বিগত সরকার ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের বিচার দ্রুত চললেও আন্দোলন দমনে সরাসরি মাঠে অংশ নেওয়া অভিযুক্তদের বিচারে নেই গতি।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে ঢাকা মহানগরে দায়ের ৩৭ মামলায় তদন্ত শেষে ১ হাজার ৩৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে তাদের কাউকে এখন পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি। আর ২২ হত্যাসহ ৩১ মামলায় সত্যতা না পাওয়ায় ৪ হাজার ৩৬৫ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে, যা অভিযুক্তদের চেয়ে তিন গুণ।
জুলাই আন্দোলনের ঘটনার মামলাগুলোতে শত শত ব্যক্তিকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তদন্ত কর্মকর্তাদের। অনেক আসামির স্থায়ী ঠিকানা দেশের বিভিন্ন জেলায় হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সমর্থনে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সাক্ষীদের জবানবন্দি রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই করতে সময় লাগছে।
১৬ থানার ৩৭ মামলায় সত্যতা মিলেছে
হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ৩৭টি মামলায় অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত ১ হাজার ৩৩০ জন। এর মধ্যে ধানমন্ডি থানার তিনটি হত্যাচেষ্টা মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এই তিন মামলায় আসামি ৫৭ জন। কলাবাগান থানার একটি হত্যাচেষ্টার মামলায় অভিযুক্ত ৫৮ জন। চকবাজার থানার দুই হত্যাচেষ্টা মামলায় ৭০, লালবাগে দুই হত্যা মামলায় ৫২, কোতোয়ালি থানার দুই মামলায় ৫৬, খিলগাঁও থানার এক হত্যাচেষ্টা মামলায় ৪৪, রামপুরার এক হত্যাচেষ্টা মামলায় ১২, যাত্রাবাড়ীর তিনটি হত্যা ও তিনটি হত্যাচেষ্টার মামলায় ১৮৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কদমতলীর একটি হত্যা ও আরেকটি হত্যাচেষ্টার মামলায় ৪৩, মোহাম্মদপুরে সাতটি মামলায় ২৫০, মিরপুরে তিন হত্যা মামলায় ১৭৬, শেরেবাংলা নগর থানার এক হত্যা মামলায় ১৫, পল্লবীর দুই হত্যা মামলায় ১৬৯, কাফরুলের এক হত্যা মামলায় ৬২, গুলশানের এক হত্যা মামলায় ২৫ এবং বাড্ডা থানার দুই হত্যা মামলায় ৫৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
২২ হত্যাসহ ৩১ মামলায় সত্যতা মেলেনি
অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে ধানমন্ডি থানার দুটি, মতিঝিলের একটি, পল্টন মডেল থানার চারটি, শাহজাহানপুর থানার দুটি, খিলগাঁও থানার একটি, যাত্রাবাড়ী থানার চারটি, কদমতলী থানার দুটি, মোহাম্মদপুর থানার ছয়টি, আদাবর থানার একটি, মিরপুর মডেল থানার একটি, শাহ আলী থানার একটি, গুলশান থানার একটি, বাড্ডা থানার দুটি, ভাটারা থানার তিনটি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
প্রতিবেদন দেওয়া এসব মামলা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ভুয়া বাদী ও ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে তোহা খান নামে এক ব্যক্তি ভুয়া এনআইডি বানিয়ে আলী মিয়াকে মৃত দেখিয়ে মামলা করেছিলেন। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে, আলী নামে কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হননি। এ ছাড়া জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়েও মামলা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল ভুল দেখিয়ে অন্য থানায় মামলা করা হয়েছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে এক ঘটনায় দুই বা ততোধিক মামলা হয়েছে।
গত ১ আগস্ট পর্যন্ত তদন্ত শেষে ৩৭ মামলায় দেওয়া হয়েছে অভিযোগপত্র। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরে পণ্যবাহী ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যাকাণ্ডের মামলাটি অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে। তবে সাতবার পেছানো হয়েছে শুনানির দিন। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল, অভিযোগপত্র গ্রহণ, বাদীকে নোটিসের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। পাশাপাশি ১০টি মামলার অভিযোগপত্র গৃহীত হয়ে বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলি করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান আগামীর সময়কে বললেন, জুলাই-সংক্রান্ত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তদন্তের অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতা এবং এজাহারে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হলেও তদন্তে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়া। তদন্তে সত্যতা না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, জুলাইয়ে হত্যাকাণ্ড বা সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি; বরং নির্দিষ্ট মামলায় এজাহারের বর্ণনা বা নির্দিষ্ট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সমর্থন করার মতো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি— এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইন উপদেষ্টার দায় রয়েছে উল্লেখ করে বিএনপির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ বলেছেন, এখন পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কোনো মামলায় বিচার শুরু না হওয়া চরম ব্যর্থতা। এখানে সবার দায় রয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী গাজী ফয়সাল ইসলাম জানালেন, একের পর এক মামলা হলেও আসামিদের জামিন হচ্ছে না। অভিযোগের সত্যতা না থাকায় এসব মামলায় আদালতে কোনো প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হচ্ছে না। এতে আসামিপক্ষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের উচিত ভিত্তিহীন মামলা দ্রুত সময়ে শেষ করে আসামিদের মুক্তি দেওয়া।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আগামীর সময়কে বলেছেন, অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে মামলাগুলোর তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত হয়ে আসা মামলাগুলোর বিচার দ্রুত সময়ে শুরু করা হবে। মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সেজন্য বিশেষ সেল গঠনের প্রক্রিয়া অব্যাহত। বিচার শুরুর পর সাক্ষীদের দ্রুত হাজির করা হবে। ভুক্তভোগী পরিবার যাতে ন্যায়বিচার পায়, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
তদন্তের বিষয়ে জানতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ও মুখপাত্র আকতার হোসেনকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি তিনি।



