হাইকোর্ট
পিতা-মাতার বৈবাহিক বিরোধ অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার স্বতন্ত্র আইনগত ও বিধিবদ্ধ। এই অধিকার পিতা-মাতার মধ্যে বৈবাহিক বিরোধের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। পারিবারিক বিরোধের এক মামলার রায়ে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রায়ে বলা হয়, তালাকের বৈধতা বা কার্যকারিতা নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে ভরণপোষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে পিতার আইনগত দায় থাকে। ফলে বিয়েবিচ্ছেদ সম্পর্কিত অমীমাংসিত বিরোধের আশ্রয় নিয়ে কোনো পিতা তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ভরণপোষণ আটকে রাখতে পারেন না।
একটি রিভিশন আবেদনের শুনানি করে বিচারপতি আবদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২২ জুন এই রায় দেন। তবে পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয় বৃহস্পতিবার।
বিস্তারিত রায়ে আদালত আরও সিদ্ধান্ত দেন, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত হয়নি এমন কোনো কথিত তালাক, অথবা আইনগতভাবে অকার্যকর বলে বিবেচিত তালাককে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটিয়েছে বলে গণ্য করা যায় না। একইভাবে, এ ধরনের অকার্যকর তালাক আইন অনুযায়ী নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে পরবর্তীতে বা নতুন করে তালাক উচ্চারণের পথে কোনো আইনগত বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, শেখ নজরুল ইসলাম ও হালিমা খাতুনের বিয়ে হয় ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। পরবর্তীতে নজরুল তার স্ত্রীর কাছে ২ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে হালিমা খাতুন বাবার বাড়ি চলে আসেন। পরে ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু সন্তান জন্মের আগে থেকেই তাদের ভরণপোষণ বন্ধ করে দেন নজরুল। এমন পরিস্থিতিতে হালিমা খাতুন ও তার কন্যা দেনমোহর ও ভরণপোষণ দাবিতে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার প্রেক্ষিতে আদালতে লিখিত জবানবন্দী দেন নজরুল। বলেছেন, তিনি কখনো যৌতুক দাবি করেননি এবং নিয়মিতই স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ দিয়ে যাচ্ছেন। এতে আরও জানানো হয়, তার স্ত্রীর সঙ্গে তার তালাক কার্যকর হয়েছে ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর।
উভয়পক্ষকে শুনানি করে বিচারিক আদালত সিদ্ধান্ত দেন, নজরুল তালাকের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
এই রায়ের বিরুদ্ধে বাগেরহাট জেলা জজের আদালতে আপিল করেন নজরুল। জেলা জজ তার আপিল খারিজ করে দিয়ে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। পরবর্তীতে তিনি জেলা জজের সিদ্ধান্তের বিপরীতে ২০১৯ সালে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন দাখিল করেন। ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর সেই রিভিশন আবেদন খারিজ করে রায় দেন হাইকোর্ট।
ইতোমধ্যে বিচারিক আদালতের সিদ্ধােন্তর প্রেক্ষিতে হালিমা খাতুন নিজের ও সন্তানের ভরণপোষণের দাবিতে ২০১৮ সালে একটি এক্সিকিউশন মামলা করেন এবং তার পক্ষে ডিক্রি পান।
এমন পরিস্থিতিতে নজরুল ২০২২ সালে বাগেরহাট সদর সিনিয়র সহকারি জজ আদালতে আরও একটি দেওয়ানি মামলা করেন। তার স্ত্রীকে দেওয়া তালাক কার্যকর হয়েছে এমন ঘোষণা চাওয়া হয় তাতে। এই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর করা এক্সিকিউশন মামলাটির আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে একটি আবেদন করেন তিনি। কিন্তু আদালত তাও খারিজ করে দিলে তিনি ২০২৩ সালে হাইকোর্টে নতুন করে একটি রিভিশন মামলা করেন। এই মামলার শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ২২ জুন রায় দেন হাইকোর্ট।
রায়ে আদালত বলেছেন, নথিতে থাকা উপকরণগুলো থেকে আরও প্রতীয়মান হয় যে, আবেদনকারী ডিক্রির মাধ্যমে তার ওপর আরোপিত দায়-দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। দেনমোহরের ডিক্রিকৃত অর্থ সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হয়নি। একইভাবে, আবেদনকারী তার অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার ভরণপোষণের চলমান আইনগত দায়িত্বও পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
আরও দেখা যায়, পুরো কার্যক্রমজুড়ে আবেদনকারী ধারাবাহিকভাবে দাবি করে এসেছেন, ইতোমধ্যে একটি কার্যকর তালাক উচ্চারিত হয়েছে। তবে এ ধরনের দাবি সম্পূর্ণভাবে অপ্রমাণিতই রয়ে গেছে। আবেদনকারী বিচারিক আদালতে, আপিল আদালতে ও হাইকোর্ট বিভাগে কথিত তালাকের বিষয়টি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
আদালতে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আবেদনকারী যদি সত্যিই মনে করেন বৈবাহিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পুনর্মিলনের কোনো যুক্তিসঙ্গত সম্ভাবনা নেই। তাহলে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ কাঠামোর অধীন বিধান অনুসারে নতুন করে বিয়ে বিচ্ছেদের প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ আইন তাকে এখনো দেয়। তবে এ ধরনের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ তাকে ইতোমধ্যে কার্যকরযোগ্য ডিক্রির মাধ্যমে তার ওপর আরোপিত দায়-দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না।
আদালতে আদেশ করেন, নজরুলকে আইন অনুযায়ী ডিক্রিকৃত দেনমোহরের বকেয়া অর্থ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার প্রাপ্য ভরণপোষণের সকল বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে ডিক্রির বকেয়া দায়-দেনা পরিশোধ করতে হবে। তবে, তিনি যদি ডিক্রি কার্যকরকারী আদালতের সামনে প্রকৃত আর্থিক সংকট প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে ওই আদালত তার বিচারিক বিবেচনা প্রয়োগ করে ন্যায়সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক বলে বিবেচিত শর্তসাপেক্ষে, উপযুক্ত কিস্তিতে ডিক্রিকৃত অর্থ পরিশোধের অনুমতি দিতে পারবে। তবে এতে কোনোভাবেই ডিক্রিধারীর অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
আবেদনকারী নজরুল ইসলামের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। অন্যদিকে বিবাদী হালিমা খাতুনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ও তানজিলা রহমান জুই।






