আনার অপহরণ মামলা
আড়াই বছরেও ডিএনএ রিপোর্ট পায়নি সিআইডি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রায় আড়াই বছর আগে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণের মামলা হয়। মামলাটির তদন্তভার প্রথমে পেয়েছিল পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এক বছর পর নতুন করে দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তভার পেয়েই সংস্থাটি সাবেক এমপি আনারের ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও এখনো আসেনি সেই রিপোর্ট। শেষ হয়নি অপেক্ষাও। এখন এই রিপোর্টের অপেক্ষায় থমকে আছে মামলার তদন্ত কার্যক্রম। কবে নাগাদ এই রিপোর্টের তথ্য হাতে পাবে সিআইডি, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা। আনারের মৃতদেহ শনাক্ত করতে এখন সংস্থাটির অপেক্ষা ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৪ সালের ১২ মে গেদে সীমান্ত দিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন তৎকালীন এমপি আনার। পরদিন তিনি নিখোঁজ হন। ১৮ মে কলকাতার অদূরে বরানগর থানায় তার বন্ধু গোপাল বিশ্বাস নিখোঁজ ডায়েরি করে। শুরু হয় পুলিশি তদন্ত। এরপর নিউ টাউনের সনজিভা গার্ডেনস নামের একটি বহুতল ভবনে তার খুন হওয়ার কথা জানায় সিআইডি। তবে এ তথ্য জানলেও আনারের দেহ পাননি তদন্তকারীরা। যদিও ওই ভবনের সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে সন্দেহজনক মাংসখণ্ড উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
ওই বছরের নভেম্বরে আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে ডিএনএ নমুনা দেন। ২০ ডিসেম্বর বাবার দেহাংশের সঙ্গে মিলেছে মেয়ের ডিএনএ মিলেছে বলে জানান ডরিন। এই অবস্থায় গত বছরের ১৩ মে ডিবি পুলিশকে এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দায়িত্ব পায় সিআইডি। প্রথমে মামলাটি তদন্ত করছিলেন পরিদর্শক খান মো. এরফান। তবে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো উদঘাটন করতে পারেননি। সম্প্রতি মামলাটির তদন্তভার পেয়েছেন সিআইডির উপপরিদর্শক এস কে আওরঙ্গজেব।
আগামীর সময়কে তিনি বলেন, ‘আমরা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়েছি। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোন উত্তর বা প্রতিবেদনে হাতে পাওয়া যায়নি। ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে তথ্য পেলেই মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক রফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ছিল এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন। তবে ওইদিন আদালতে কোনো প্রতিবেদন জমা হয়নি। এজন্য ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৪ নভেম্বর দিন ঠিক করেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে মামলার বাদী ডরিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ মে সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে মামলা হয়। মামলায় আসামি করা হয় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের।
পরে এ মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝিনাইদহ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু, শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ সাঈদ, তানভীর ভূঁইয়া, আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামাল আহমেদ ওরফে গ্যাস বাবু, শিলাস্তি রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান ফকির ও ফয়সাল আলী সাহাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।
এই সাত আসামির মধ্যে মিন্টু ছাড়া বাকি ছয়জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাদের মধ্যে শিলাস্তি রহমান ২০২৪ সালের ৩ জুন, তানভীর ভূঁইয়া ৪ জুন, শিমুল ভূঁইয়া ৫ জুন, গ্যাস বাবু ১৪ জুন, মোস্তাফিজুর রহমান ফকির ২ জুলাই এবং ফয়সাল আলী সাহাজী ৩ জুলাই জবানবন্দি দেন।
তবে পরে তারা এসব জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তাদের অভিযোগ, পুলিশ আগে থেকেই জবানবন্দি লিখে রেখেছিল এবং নির্যাতন করে তাতে স্বাক্ষর নেয়। এমনকি জবানবন্দি পড়ে দেখার সুযোগও দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
আসামিদের মধ্যে একমাত্র গ্যাস বাবু জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন। অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় জামিন পেয়েও কারামুক্ত হতে পারেননি মিন্টু। বাকি পাঁচ আসামি এখনো কারাগারে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৯ মে রাত ৮টার দিকে গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হন আনার। ১১ মে বিকাল পৌনে ৫টার দিকে মেয়ে ডরিন ভিডিও কলে বাবার সঙ্গে কথা বলেন। তখন তার কথাবার্তা কিছুটা অসংলগ্ন মনে হয় ডরিনের। এরপর বাবার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও সেটি বন্ধ পান তিনি।
১৩ মে আনারের ভারতীয় নম্বর থেকে ডরিনের মামা উজিরের হোয়াটসঅ্যাপে একটি খুদে বার্তা আসে। তাতে লেখা ছিল, ‘আমি হঠাৎ করে দিল্লি যাচ্ছি, আমার সঙ্গে ভিআইপি রয়েছে। আমি অমিত সাহার কাজে নিউ টাউন যাচ্ছি। আমাকে ফোন দেওয়ার দরকার নেই। আমি পরে ফোন দেব।’
এরপর আরও কয়েকটি বার্তা আসে। ডরিনের সন্দেহ, তার বাবার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অপহরণকারীরা এসব বার্তা পাঠিয়ে থাকতে পারে।
এজাহারে ডরিন উল্লেখ করেন, বাবার খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও তার সন্ধান পাননি তারা। পরে আনারের বন্ধু গোপাল বিশ্বাস কলকাতার বরানগর থানায় নিখোঁজের জিডি করেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারেন, অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পরের যোগসাজশে তার বাবাকে অপহরণ করেছে।




