ঋণখেলাপিরা পাবেন না করদাতার সম্মাননা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুর্নীতি, কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং, অনিয়ম কিংবা ঋণখেলাপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকলে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী হলেও সেরা করদাতা সম্মাননার তালিকা থেকে বাদ পড়তে হবে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার তদন্তে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলেও করদাতাকে এই সম্মাননার জন্য বিবেচনা করা হবে না।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বেশি কর পরিশোধের পরিবর্তে করদাতার স্বচ্ছতা, নিয়মিত কর পরিপালন এবং আর্থিক শৃঙ্খলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার ‘সেরা করদাতা সম্মাননা প্রদান নীতিমালা, ২০২৬’ প্রকাশ করেছে সরকার। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জারি করা এ
নীতিমালা ‘২০০৮ সালের সেরা করদাতা পুরস্কার নীতিমালার’ পরিবর্তে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে ব্যক্তি, পেশাজীবী, কোম্পানি ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারীদের সম্মাননা দেওয়ার পাশাপাশি কারা এ সম্মাননা পাওয়ার অযোগ্য হবেন, তা স্পষ্ট করা হয়েছে।
নীতিমালার সবচেয়ে কঠোর শর্তগুলোর একটি হলো— কোনো করদাতার বিরুদ্ধে সরকারি সংস্থার তদন্তে কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং, আন্তর্জাতিক অপরাধ, দুর্নীতি বা অনিয়মের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলে তাকে সেরা করদাতা হিসেবে নির্বাচনের সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণগ্রহীতাদেরও অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থঋণ আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর বছরে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে— এমন করদাতারাও সম্মাননার জন্য বিবেচিত হবেন না।
শুধু দুর্নীতি বা ঋণখেলাপিই নয়; কর পরিপালনে অনিয়ম থাকলেও সম্মাননা মিলবে না। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কর পরিশোধে ব্যর্থ হলে, অবিতর্কিত বকেয়া কর থাকলে কিংবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন ও উৎসে করের রিটার্ন দাখিল না করলে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে অযোগ্য বিবেচনা করা হবে।
আন্তর্জাতিক লেনদেনকারী কোম্পানির ক্ষেত্রেও রয়েছে বাড়তি শর্ত। নির্ধারিত সময়ে ‘স্টেটমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজেকশন’ দাখিল না করলে সম্মাননার জন্য বিবেচিত হওয়া যাবে না। আয়কর বা দানকর ফাঁকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে কিংবা সংশ্লিষ্ট মামলা পুনঃউন্মোচিত হয়ে বিচারাধীন থাকলেও করদাতাকে তালিকায় রাখা হবে না।
কাস্টমস, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আবগারি শুল্ক, স্ট্যাম্প শুল্ক বা দানকর বাবদ অবিতর্কিত পাওনা থাকলেও সেরা করদাতার সম্মাননা পাওয়া যাবে না।
নতুন নীতিমালায় ব্যক্তি, কোম্পানি ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাত মিলিয়ে ৭২ জন করদাতাকে সেরা করদাতা সম্মাননা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ব্যক্তিপর্যায়ে ৩৩ জন, কোম্পানি পর্যায়ে ১৫টি এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে ২৪টি কোম্পানিকে এ স্বীকৃতির আওতায় আনা হবে। ব্যক্তিপর্যায়ে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ১৫ জন ছাড়াও সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে এক নারী ও এক পুরুষ, এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং পাঁচ নারী করদাতাকে সম্মাননা দেওয়া হবে।
কোম্পানি পর্যায়ে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ১৫টি কোম্পানির পাশাপাশি ব্যাংকিং, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জীবনবীমা, সাধারণ বীমা, চিকিৎসাসেবা, তৈরি পোশাক, প্রকৌশল, ইস্পাত, কৃষি ও খাদ্য, জ্বালানি, পাট, স্পিনিং ও টেক্সটাইল, ওষুধ ও রসায়ন, গণমাধ্যম, রিয়েল এস্টেট, চামড়া, শিক্ষা, পর্যটন, চা ও সিরামিকসহ বিভিন্ন খাতের কোম্পানিকে সম্মাননা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সেরা করদাতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াও তিন ধাপে সম্পন্ন হবে— প্রাথমিক বাছাই, যাচাই ও চূড়ান্ত নির্বাচন। কর অঞ্চল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক তালিকা তৈরি হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও দপ্তর থেকে তথ্য নিয়ে করদাতার যোগ্যতা যাচাই করা হবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করদাতাদের নাম গেজেটে প্রকাশ করা হবে। তাদের করদাতা সম্মাননা কার্ড ও ক্রেস্ট দেওয়া হবে। গেজেটে নাম প্রকাশের পর দুই বছর পর্যন্ত সম্মাননা কার্ডের মেয়াদ ও নির্ধারিত সুবিধা বহাল থাকবে।
এর আগে ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ১৪১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্স কার্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০২২-২৩ করবর্ষে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতা হিসেবে ৭৬ ব্যক্তি, ৫৪ প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ১১টি শ্রেণিতে সম্মাননা দেওয়া হয়।





