নকশাতেই বন্দি পাতালপুরীর স্বপ্ন!
- দিনে ৮ লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য
- কাঞ্চন সেতু-কমলাপুর ৩১.২৪ কিমি দৈর্ঘ্য
- দরপত্র বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬ হাজার কোটি টাকা

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
রাজধানীর বুকে যানজটের বিষফোড়া যখন প্রতিদিনের জীবন বিষিয়ে তুলছে, তখন উত্তরের আকাশ ছুঁয়ে চলা মেট্রোরেল দিয়েছিল এক পশলা স্বস্তির নিঃশ্বাস। উত্তরা থেকে মতিঝিল উড়াল পথের রূপকথা রূপ নিয়েছে বাস্তবে। কাগুজে আঁকা নকশায় বন্দি থাকা মেট্রোরেল এখন ছুটছে, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটেই চলেছে। আপাতত যাত্রার গণ্ডি বাধা উত্তরা থেকে মতিঝিল। সব ঠিক থাকলে হয়তো মতিঝিল পেরিয়ে এই ট্রেন আগামী বছরের শুরুর দিকে পৌঁছাবে কমলাপুর। সেখানে মেট্রো যুক্ত হবে দেশের প্রচলিত রেলপথের সঙ্গে। কিন্তু এসবই তো পুরনো কথা। নতুন মেট্রো কোথায়?
ঢাকার বুক খুঁড়ে মাটির তল দিয়ে যে ‘পাতালপুরীর’ স্বপ্ন দেখার কথা ছিল, সেই এমআরটি লাইন-১-এর ভবিষ্যৎ এখন ধোঁয়াশায় ঢাকা। যে সুড়ঙ্গ দিয়ে দ্রুতগতির ট্রেনের ছুটে চলার কথা, সেখানে এখন শুধুই অনিশ্চয়তার অন্ধকার।
কথা ছিল রাজধানী ঢাকা ঘিরে ফেলা হবে মেট্রোরেলের নেটওয়ার্ক জালে। গণপরিবহনের বিকল্প নয়, বরং ২০৩০ সালের মধ্যে মেট্রোই হবে ঢাকার মূল গণপরিবহন— বারবার আওড়ানো হয়েছিল এমনই আশাবাদের বুলি। পরিকল্পনায় পাঁচটি পথে বসার কথা ছয়টি রেলপথ। যাতে থাকার কথা ছিল পাতাল ও উড়াল পথের সমন্বয়। কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু বিপত্তি বাধে সরকার পরিবর্তনে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসার পর বন্ধ করে দেওয়া হয় মেট্রোরেল প্রকল্পের সব কাজ। এমনকি মতিঝিল-কমলাপুর অংশের মাত্র এক কিলোমিটারের একটু বেশি পথের কাজও পিছিয়েছে এক বছর। আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া প্রকল্পে ভরসা রাখতে পারেনি তৎকালীন ইউনূস সরকার। ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ হচ্ছে— এমন যুক্তি দেখিয়ে দরপত্রে অংশ নিয়ে সবচেয়ে কম মূল্যে কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেনি তখনকার সরকার।
কাগুজে নকশায় সব ঠিকঠাক। ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের বড় অংশই (১৯ দশমিক ৮৭ কিমি) বাস্তবায়ন হওয়ার কথা মাটির নিচে। কথা ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর এবং নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত মাটির নিচ ও ওপর দিয়ে ছুটবে ট্রেন। দিনে আট লাখ যাত্রী পরিবহন সক্ষমতার লক্ষ্য নিয়ে শুরু করা এই মেগা প্রকল্প এখন স্থবির। উত্তরা-মতিঝিল রুটের কাজ শেষপর্যায়ে থাকলেও এমআরটি লাইন-১-এর কাজ শুরুর আগেই খেয়েছে হোঁচট।
দরপত্রের নিয়মে আবার চুক্তির সময় আটকে আছে। আগামী জুনের মধ্যে করতে হবে এই চুক্তি। দরপত্রে অংশ নিয়ে সবচেয়ে কম মূল্যে যে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করতে চেয়েছিল, তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে কাজের ভার। তা না হলে ‘বিফলে মূল্যফেরত’ দশা হবে। ফিরিয়ে দিতে হবে জামানত। নতুন করে আহ্বান করতে হবে দরপত্র। তবে এতে ব্যয় যে কমবে না, সেটি নিশ্চিত। কেননা, এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী। ডলারের বিপরীতে কমেছে টাকার মান। নির্মাণসামগ্রীর দামও বেড়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা ভবিষ্যৎ যতটুকু দেখছেন, তাতে তাদের বিশ্বাস, জুনের মধ্যে চুক্তি করবে না বর্তমান সরকারও। আর তা যদি হয়ও, তা হতে পারে ১২টি প্যাকেজের মধ্যে দু-একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। বাকিগুলোর কী হবে— এ প্রশ্নের জবাব আপাতত থাকছে অজানাই। কারণ এক পথ নির্মাণ ও বাস্তবায়নের খণ্ড যে ১২টি।
আওয়ামী আমলে পাতাল মেট্রোর ডিপো নির্মাণকাজ শুরু, এরপর আর অগ্রগতি নেই কেন? কাজের অগ্রগতি কতদূর? পাতাল মেট্রোরেলের ভবিষ্যৎই বা কী? পাতালপুরীর পথে ছুটছে না তো পাতাল মেট্রোরেল? রয়েছে এমন আরও বহু প্রশ্ন। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকেই পাওয়া গেল না এসবের উত্তর নেওয়ার।
প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আপাতত কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন মো. সারওয়ার উদ্দীন খান। এটি তার অতিরিক্ত দায়িত্ব। দুটি বিষয় জানতে চাইলে তার উত্তর সাফ ‘না’। ‘আমাদের কথা বলতে মানা করা আছে, যা কথা হবে সবই এমডি স্যারের দপ্তর থেকে।’
‘উপকারের’ উদ্দেশ্যে দিলেন পরামর্শও। ‘এমডি স্যার অথবা পিআরও দপ্তরে যোগাযোগ করেন। প্রকল্প নিয়ে আমি কোনো কথাই বলতে পারব না।’
মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে সরকার। নাম ‘ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)’। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান।
জবাবের আশায় চারটি প্রশ্ন করা হয় তাকে। কিন্তু উত্তরে পাওয়া যায় শুধুই তিনটি শব্দ, ‘আমরা রিভিউ (পর্যালোচনা) করছি’।
যদিও এই ‘পর্যালোচনা’কে শুধুই উসিলা মনে করছেন কেউ কেউ। ডিএমটিসিএলের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। অআনুষ্ঠানিক আলাপনে তারা বলেন, রিভিউ শুধুই বাহানা। তলে তলে খোঁজা হচ্ছে নতুন অর্থায়নও। বিকল্প পেলে জাইকার সঙ্গে তর্কে শক্তি পাবে সরকার। জাপানের বদলে ঝুঁকতে পারে কাজ চীনের দিকে। বড় কাজ, লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ। ফলে নতুন বড় বিনিয়োগের আগে গুরুত্ব পাবে সরকারের কূটনৈতিক সমীকরণ।
যদিও বিশেষজ্ঞদের ভাবনায়, কাজ দেরি করা ঠিক হবে না। কেননা, মেট্রোতে যাত্রী পাওয়া যায়। এটি দীর্ঘমেয়াদে ঠকাবে না। লাভসহ ফিরে আসবে বিনিয়োগ।
তাই যেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানের কণ্ঠ শক্ত, ‘মেট্রো করতেই হবে। এটা নগর জীবনে শান্তি এনে দিয়েছে। সরকারের উচিত মেট্রোর মতো প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখা। কীভাবে সব ঠিক রেখে দ্রুত মেট্রোরেল বাস্তবায়ন করা যায়— সেই পথ সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে।’
হয়নি নতুন চুক্তি, থেমেছে পুরনো
২০২২ সালে শুরু হওয়া এই কাজের জন্য এখন পর্যন্ত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারেনি ডিএমটিসিএল। উল্টো যে দুটি অংশের কাজের জন্য দরপত্র শেষে চুক্তি হয়েছিল, সেগুলোর অগ্রগতিও থমকে।
এমনকি চুক্তি বাতিল করতে চেয়ে জাইকাকে চিঠি দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও তারা তাতে সায় দেয়নি। জবাব ছিল স্পষ্ট, ‘নিয়ম মেনেই টেন্ডার হয়েছে। সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকেই কাজ দেওয়া হয়েছে।’ খোদ ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত মেট্রোর কাজের গতি বাড়াতে সরকারকে দিয়েছিলেন চিঠি।
এদিকে পুরনো দরপত্রে খরচ বেড়েছে ৮৫ শতাংশ, নতুনে আরও বাড়বে নিশ্চিতভাবেই। দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালের ধারণামূলক নকশা প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি হয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি)। এতে ব্যয় ধরা হয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকার বরাদ্দ ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা।
দরপত্রে খরচ বেড়েছে ৮৫%, নতুনে আরও বাড়বে
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালের ধারণামূলক নকশা প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি হয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি)। এতে ব্যয় ধরা হয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার (জাইকা) বরাদ্দ ছিল ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ, আর সরকার দেবে ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা। জাইকার অর্থায়নে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০২২ সালে শুরু হয় প্রকল্পের কার্যক্রম।
প্রাকযোগ্যতা পর্যায়ে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, মিশর, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। মূল দরপত্র কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৩ সালে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আগেই ব্যয় প্রায় ৮৫ শতাংশ বাড়ে।
কেন খরচ বাড়ল?
মূলত নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় ব্যয় বেড়েছে আশাতীত। দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা না গেলে তা আরও বাড়তে পারে। যদিও ডিএমটিসিএলের সাবেক এমডি ফারুক আহমেদ একাধিকবার এই ব্যয় বৃদ্ধির জন্য দায়ী করেছেন জাপানি কোম্পানি ও জাইকার শর্তকে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মত, প্রাথমিক নকশার ওপর নির্ভর করে যে ব্যয় ধরা হয়, তা চূড়ান্ত বিবেচনা করা ঠিক নয়। দরপত্রের পরই মূল দর নির্ধারণ হয়।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মন্ত্রীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে মেট্রোর বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এখন ভবিষ্যৎ কী হবে-সে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
মেট্রোরেলের মতো জরুরি গণপরিবহনের কাজ ঝুলিয়ে রাখা ঠিক হচ্ছে না বলেই মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন। তার ভাবনায়, রাজধানীর গণপরিবহনে মেট্রোরেল আশীর্বাদ। ‘খরচ রিভিউ (পুনর্মূল্যায়ন) করা যেতে পারে। কিন্তু এতে বছরের পর বছর পার করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। আর এখানে রিভিউ কমিটি আছে, পরামর্শক আছে। অযৌক্তিক ব্যয় বাড়ার সুযোগ দেখি না। সব কথার মূল কথা হচ্ছে, যত দ্রুত সম্ভব মেট্রোরেলের কাজ শুরু করা দরকার।’
এক রেখায় আসবে কাঞ্চন-কমলাপুর
রাজধানীর কাঞ্চন সেতু থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩১.২৪ কিলোমিটার পথটি ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ নামে পরিচিত হবে। এর মধ্যে ১৯.৮৭ কিলোমিটার মাটির নিচ দিয়ে, বাকি ১১.৩৭ কিলোমিটার যাবে উড়ালপথে।
প্রকল্পের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে কাজ শেষ হলে প্রতিদিন প্রায় ৮ লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারতেন। এতে যানজট, জীবাশ্ম জ্বালানি ও সময় ব্যয়—সবই কমত। প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। তখন বিস্তারিত জরিপ, নকশা এবং ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৯৩ একর জমিতে ডিপো নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কাজ তত্ত্বাবধানে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগও প্রায় চূড়ান্ত।
কোন পথ, কত ট্রেন
বিমানবন্দর রুটে থাকবে ১২টি পাতাল স্টেশন। যার মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, কমলাপুর। পূর্বাচল রুটে থাকবে নতুনবাজার, বোয়ালিয়া, স্টেডিয়াম ও পূর্বাচল টার্মিনালসহ ৯টি উড়াল স্টেশন।
বর্তমান মেট্রো থেকে নতুন পথে ট্রেন সেট ও কোচের সংখ্যা বাড়বে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে চালু হবে ৮ কোচের ২৫ সেট ট্রেন। বর্তমানে এক সেট ট্রেনে কোচ থাকে ছয়টি। পথে ট্রেন চলে ২০টি। ভবিষ্যতে নতুন পথে ৩৬ সেট ট্রেন সেট চালানোর ভাবনা। প্রতিটি ট্রেন ২৫ মিনিটে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর, আর ২১ মিনিটে নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পৌঁছাতে পারবে।
















