উচ্ছেদেও ফাঁকা হয় না ফুটপাত
- সকালে অভিযান বিকালে ফের দখল
- উচ্ছেদের খবর আগেই পান হকাররা
- হকার উচ্ছেদেও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ
- মিরপুরে উচ্ছেদে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪ মামলায় আসামি ২০০০, গ্রেপ্তার ২৫

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ও সড়কের সৌন্দর্য ফিরিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে বারবার চলে অভিযান। উচ্ছেদে হকারদের চৌকি, ছাউনি ও বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করা হলেও মুক্ত হয় না চলাচলের পথ। দিন শেষে ফের দখল হয়ে যায় এসব অস্থায়ী দোকানের জায়গা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দু-এক দিন আবার কোনো ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ পর হলেও চলে যায় দখলদারদের কবজায়। পুরোপুরি ফাঁকা হয়নি কখনোই।
ফুটপাতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের খবর আগেভাগেই পেয়ে যান হকাররা। আবার অভিযান নিয়েও চলে রাজনীতি। খালি করা জায়গা নতুন করে কবজায় নেয় আরেকপক্ষ, যেন অভিযান মানেই হাতবদলের সুযোগ। এ কারণে স্থানীয় রাজনীতিকদের একাংশ থাকেন উচ্ছেদের পক্ষে, আবার আরেক অংশ বিপক্ষে। প্রতিবার জায়গা খালি করার পর বেড়ে যায় ভাড়ার পরিমাণ। লেনদেন হয় বিপুল অঙ্কের টাকা। অন্যদিকে হকারদের জন্য নীতিমালা থাকলেও তা মানছে না কেউ। তবে তাদের অভিযোগ— উচ্ছেদ অভিযান লোকদেখানো, টাকা দিয়েই দোকান বসানো হলেও বারবার উচ্ছেদ কেন? স্থায়ী সমাধান চাইলে পুনর্বাসনের বিকল্প নেই।
স্থানীয়রা বললেন, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবই এ হকার সমস্যার মূল কারণ। এ ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা না থাকা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, লোকদেখানো অভিযান, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না ফুটপাত।
বিভিন্ন সময় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ফুটপাতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালায়। তবে অভিযানের কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে আবারও বসে পড়েন দখলদাররা। ফলে কাজে আসে না অভিযান।
এ বিষয়ে জানতে একাধিক হকার, লাইনম্যান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামে কর্মসংস্থান না থাকায় শহরে আসছেন মানুষ। শহরেও পর্যাপ্ত চাকরি না থাকায় ফুটপাতে ব্যবসা করছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। দোকান ভাড়া ও কর্মচারীর খরচ বেশি হওয়ায় ফুটপাতকেই বেছে নিচ্ছেন তারা। আবার এখান থেকে বড় অঙ্কের চাঁদা ওঠায় এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখছে প্রভাবশালী মহল। গত মঙ্গলবার মিরপুরের বাসিন্দা সিয়াম মাহমুদ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘হঠাৎ দেখি ফুটপাত ফাঁকা। হকার, অবৈধ ও ভাসমান দোকান সব তুলে দেওয়া হয়েছে। রাস্তায় হেঁটে খুব আরাম। ভিড় নেই, কারও সঙ্গে ধাক্কা লাগে না। কিন্তু দেখা যাবে দু-তিন দিন পর ফের ফুটপাত ভরে গেছে হকারে!’ মিরপুর গার্লস স্কুলের নিরাপত্তাকর্মী রাহাত বলেছেন, উচ্ছেদ হলে সড়কটা দেখতে ভালোই লাগে। চার লেনের এই রাস্তা ফুটপাতের জন্য হয়ে যায় এক লেন, লেগে থাকে সকাল-সন্ধ্যা যানজট। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এটি এক-দুদিন বা পাঁচ দিন ফাঁকা থাকবে সর্বোচ্চ। পরে আবার যেই সেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও নগরবিদ ড. আকতার মাহমুদের মতে, ঢাকার ফুটপাত হকারমুক্ত না হওয়ার প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে। উচ্ছেদের পর নজরদারির অভাব এবং পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারা। অভিযানে জায়গা খালি হলেও শক্তিশালী চাঁদাবাজ নেটওয়ার্ক ও প্রশাসনের অসৎ অংশকে টাকার বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করে আবার ফুটপাত দখল করেন হকাররা।
‘যেকোনো মূল্যে ফুটপাত দখলমুক্ত রেখে তা পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। পাশাপাশি হকারদের উচ্ছেদের পর তাদের জন্য বিকল্প ও সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব জেলা বা অঞ্চল থেকে মানুষ জীবিকার খোঁজে ঢাকামুখী হচ্ছেন, সেসব এলাকায় স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, যাতে তাদের ঢাকায় আসার প্রবণতা কমে’— পরামর্শ দিলেন তিনি।
ফুটপাত আবার দখলের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, জনগণের পথ চলাচলের ফুটপাত জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং কেউ যদি আবার বসেন, তাহলে আরও দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে কঠোর অবস্থানে উচ্ছেদ করা হবে। কোনো ছাড় নয়।
অন্যদিকে অবৈধভাবে হকার বসলে উচ্ছেদের পাশাপাশি তাদের মালপত্র ক্রোক ও আইনি ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছেন ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম।
হকার নীতিমালা মানছে না কেউ: দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঢাকার ফুটপাত নিয়ে পুরনো ছক থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেয় বিএনপি সরকার। উচ্ছেদের বদলে পুনর্বাসন, নিবন্ধন ও নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয় নতুন উদ্যোগ। হকারদের জন্য ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ শিরোনামে নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার। তাতে স্থান পেয়েছে— হকারদের নিবন্ধন, ব্যবসা পরিচালনার নির্দিষ্ট সময় ও স্থান এবং প্রশাসনিক তদারকির মতো বিষয়। কিন্তু এটি মানছে না কেউ। একাধিক হকার প্রকাশ্যে বলছেন, ‘কীসের কার্ড, কীসের নীতিমালা। আমরা টাকা দিয়ে দোকান দিই। সন্ধ্যা হলেই টাকা দিতে হয়, তাহলে নীতিমালা কেন?’
মিরপুরে উচ্ছেদে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪ মামলায় আসামি ২০০০: রাজধানীর মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষের ঘটনায় দুই থানায় হয়েছে চারটি মামলা। এসব মামলায় গতকাল বিকাল পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছেন পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার। চার মামলার মধ্যে মিরপুর মডেল থানায় হয়েছে তিনটি, যার মধ্যে দুটির বাদী পুলিশ এবং একটি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এসব মামলায় ১৭ জনের নাম উল্লেখসহ প্রতিটিতে আসামি করা হয়েছে নাম না জানা আরও ৪০০-৫০০ জনকে। মামলাগুলোতে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের গাড়ি ও ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর, সিটি করপোরেশনের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। আর গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় কাফরুল থানায় করা মামলার বাদী ডিএনসিসি। পুলিশ বলছে, ঘটনার সময়ের ভিডিও, ছবি এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে।
গত বুধবার মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে যাওয়ার সড়কের ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে ডিএনসিসির অভিযান ঘিরে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ সমাধান নয়: মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ না করে উপযুক্ত জায়গায় পুনর্বাসনের মাধ্যমে এ সমস্যার টেকসই সমাধান প্রয়োজন।
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের মতে রাজধানীতে প্রায় পাঁচ লাখ হকার রয়েছেন। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদের নামে হয়রানি, মালপত্র নষ্ট করা এবং ভাঙচুর চালানোকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলছেন হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী। তার মতে, উচ্ছেদ অভিযান প্রায়ই রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। অতীতেও এমন অভিযান হয়েছে, এখনো হচ্ছে। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কোনো সমাধান নয়।



