সাত নয়, এক দিন আগে মৃত্যু সেই বৃদ্ধার

সংগৃহীত ছবি
সাত দিন নয়, মৃত্যুর সময়কাল লাশ উদ্ধারের এক দিন বা বড়জোর তার কয়েক ঘণ্টা আগে। রাজধানীর মিরপুরে অশীতিপর নূরজাহান বেগমের মৃত্যু নিয়ে এমন নতুন তথ্য জানিয়েছেন পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। যদিও মরদেহ উদ্ধারের পরপর পুলিশেরই একাধিক কর্মকর্তা সপ্তাহখানেক আগে নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর তথ্য জানিয়ে ছিলেন। তবে তিনি কীভাবে মারা গেছেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাজধানীর মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের একটি বাসা থেকে গত রবিবার রাতে উদ্ধার হয় নূরজাহান বেগমের পচন ধরা লাশ। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে কীভাবে একটি মরদেহ এতটা পচে গেল, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা। এ ছাড়া পাশের কক্ষে থেকেও মেয়ের কিছু না জানা এবং উচ্চপদস্থ সন্তানদের অবহেলার বিষয়টিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ১৩ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাসা থেকে নূরজাহান বেগমের (৭২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বাসাটি মূলত তার মেয়ের। মায়ের কক্ষটি ছিল ময়লা-আবর্জনায় ভরা। ঘরে জন্ম নিয়েছিল অসংখ্য পোকামাকড়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিক পুলিশের সঙ্গে ঘরে ঢুকেছিলেন। তিনি জানালেন, বৃদ্ধার শরীরের বিছানার দিকের অংশটি গিয়েছিল পচে। চোখের কোনায় কোনায় জমে ছিল জ্যান্ত পোকা। লাশ সরানোর সময় পোকাগুলো খসে পড়ছিল নিচে।
পাশের কক্ষেই থাকতেন মেয়ে। এত দুর্গন্ধের পরও মেয়ে কীভাবে কিছু টের পেলেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রফিক। ভবনের ভাড়াটিয়া জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘরটি দেখে মনে হয় পাঁচ-ছয় বছর পরিষ্কার করা হয়নি। মেয়ের মানসিক ভারসাম্য নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
পল্লবী থানার ওসি মো. হাসান বাসির জানিয়েছেন, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘নূরজাহান বেগম সম্ভবত লাশ উদ্ধারের এক দিন বা তার কিছু সময় আগে মারা গেছেন।’ তবে এ-ও জানালেন যে মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সময় জানতে মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে।
লাশ উদ্ধারের মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হাসান বাসির আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বাসাটি নূরজাহানের মেয়ের। সেখানে মেয়ের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। একই বাসায় থাকলেও মায়ের কক্ষটি ময়লা-আবর্জনায় ভরা ছিল, জন্মেছে পোকামাকড়। সেখানে মানুষ থাকা সম্ভব নয়। উদ্ধারের সময় দেখা যায়, নূরজাহান বেগমের শরীরের কিছু অংশ পচে গিয়েছিল। বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ থাকলে এভাবে অযত্নে তাদের রাখা সম্ভব নয়।’
এদিকে প্রতিবেশীরা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। পাশের বাড়ির মালিক সৈয়দ হাসান পলাশ জানিয়েছেন, ঈদুল আজহার সময় চারদিকে পশুর বর্জ্য ও ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ থাকে। সেই সুযোগ নিয়ে এই বৃদ্ধাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। দুর্গন্ধের আড়ালে যেন অপরাধ ঢাকা পড়ে, সে চেষ্টা হতে পারে।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, নূরজাহান বেগমের দুই ছেলে প্রতিষ্ঠিত। এক ছেলে আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিএসই বিভাগের শিক্ষক। অন্য ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব।
সৈয়দ হাসান পলাশ বললেন, ‘এ পরিবারটি (নূরজাহান বেগম ও তার মেয়ে) কারও সঙ্গে মিশত না। তারা একাকী থাকত। মাঝেমধ্যে শুধু বাজারের জন্য বের হতো এবং শেষ করে চলে যেত। বাইরে থেকে ভিলাটি (ভবন) দেখতে কত সুন্দর! কিন্তু ভেতরের অবস্থা একদম জঘন্য।’
প্রতিবেশী শিউলি বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘সন্তানরা এত উচ্চশিক্ষিত, অথচ মা মরলেন এমন অযত্নে! যত্ন করতে না পারলে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসতে পারত। এভাবে ঘরে আটকে রাখা মানে ইচ্ছাকৃতভাবে মেরে ফেলা।’
তিনি অভিযোগ করেন, নূরজাহান বেগমের মৃত্যু অযত্নের কারণেই হয়েছে। আবার পরিকল্পিত হত্যার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। হাসান পলাশ বললেন, ‘ঈদের সময়ের পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নূরজাহান বেগমকে হত্যাও করা হয়ে থাকতে পারে। কেননা, কোরবানির ঈদের পর চারদিকে পশুর রক্ত ও বর্জ্যের পচা দুর্গন্ধের পাশাপাশি থাকে ব্লিচিংয়ের উৎকট গন্ধ। তাই এ মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত রহস্য খুঁজে বের করতে হবে। এটি হত্যাকাণ্ড হলে দায়ীদের আনতে হবে বিচারের আওতায়।’
ওই এলাকার বাসিন্দা মো. রফিক জানালেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তিনি পুলিশের সঙ্গে ঢুকেছিলেন নূরজাহান বেগমের রুমের ভেতর। ওই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বললেন, ‘শরীরের যেই অংশটি বিছানার সঙ্গে লেগে ছিল, সেই পাশটি পচে গিয়েছিল। চোখের কোনায় কোনায় ছিল পোকা, যেগুলো মরদেহ বিছানা থেকে নামানোর সময় পড়ছিল নিচে।’
মরদেহে এভাবে পচন ধরার পরও কীভাবে পাশের কক্ষ থেকে নূরজাহান বেগমের মেয়ে জানতে পারলেন না, সে প্রশ্ন তোলেন রফিক।
একই এলাকার আরেকটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন শিউলি বেগম। তার সঙ্গে আলাপনের শুরুতেই উগরে দিলেন একরাশ ক্ষোভ। বললেন, ‘এই পরিবার (নূরজাহান ও তার মেয়ে) অনেকটা অসামাজিক। কারও সঙ্গে সম্পর্ক নেই। এমন উচ্চশিক্ষিত সন্তান থাকার পরও যদি এমন অযত্নে মাকে মরতে হয়, তাহলে তাদের থেকে মানুষ কী শিখবে। যদি তারা যত্ন নিতে না পারে, তাহলে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসতে পারত। এমন অমানবিকভাবে রুমে রাখা মানে ইচ্ছাকৃতভাবেই মেরে ফেলা।’




