জন্মের পর সুস্থ ছিল শিশুরা, রাতে ওয়ার্ডে ছিল না পর্যাপ্ত চিকিৎসাকর্মী
- নিহত শিশুরা ছিলো পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে

রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে মৃত ছয় শিশু জন্মের পর সুস্থ ছিল বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। তবে তাদের অভিযোগ রাতে ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসাকর্মী ছিল না। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে শিশুদের অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হাসপাতালের এক ওয়ার্ড ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় শোক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ডিএমপি কমিশনারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
মৃত এক নবজাতকের মামা জানিয়েছেন, রাতে বাচ্চা কোলে নিয়ে বসেছিলাম কিছুক্ষণ। বাচ্চা পুরো সুস্থ ছিল। অনেকক্ষণ সুন্দর করে হাসি দিয়েছিল। পরে পুরুষ থাকা নিষেধ বলে তাকে সেখান থেকে নিচে চলে যেতে বলা হয়। এরপর রাত ৩টার দিকে তার মা ফোন করে জানিয়েছেন যে, বাচ্চা খুব কাঁদছে এবং তার বোনের অবস্থাও কেমন জানি লাগছে। তিনি ওপরে এসে দেখেন কোনো নার্স নেই এবং বাধা দেওয়া সত্ত্বেও তিনি ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপর নার্স বলেন আপনি এখানে আসছেন ক্যান? উত্তরে তিনি বলেন যে, বাচ্চা কাঁদছে তাই আসছি কিন্তু আপনাদের তো ওখানে যাওয়া উচিত ছিল।
তিনি জানিয়েছেন, ভোর ৫টার দিকে মা আবার ফোন করে বললেন, যে বাচ্চা এতক্ষণ কান্নাকাটি করে এখন শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু এর আধা ঘণ্টা পর মা আবার ফোন দিয়ে জানিয়েছেন, বাচ্চার অবস্থা ভালো নয় এবং তাকে আইসিইউতে নিতে হবে। তিনি দ্রুত বাচ্চাকে নিয়ে পাঁচতলায় যান, কিন্তু বাচ্চাটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, হাসপাতালের ওয়ার্ডে এসির হঠাৎ ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর সেখান থেকে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুদের অবস্থার তাৎক্ষণিক অবনতি ঘটলে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়।
অন্য এক শিশুর স্বজন জানিয়েছেন, পুরো ওয়ার্ডেই একটা গন্ধ ছিল। এখানে কর্তব্যরত নার্সরা কি তা খেয়াল করেনি। বড় মানুষেরই তো ওই গন্ধে মাথা ঘুরায়, সেখানে এত ছোট্ট শিশুরা কীভাবে থাকতে পারে।
বুধবার দুপুরে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে সিজারের পর মা ও নবজাতকদের রাখা হয়। বাচ্চারা সুস্থ ছিল। রাতে কোনো এক বাচ্চার মা এসি বন্ধ রাখতে বলেছিলেন। অনেক সময় গরম বা ঠান্ডা লাগার কারণে চাহিদামতো এসি বন্ধ বা চালু রাখা হয়।
ডা. নাহিদ ইয়াসমিনের ভাষ্য, মঙ্গলবার রাত ৩টার দিকে দুটি বাচ্চা হঠাৎ একটু অসুস্থ হওয়ায় তাদের নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকরা তাদের অবস্থা ভালো দেখে পরে আবার ওয়ার্ডে ফেরত পাঠিয়ে দেন। পরে ভোর ৬টার দিকে দায়িত্বরত নার্স দেখেন যে, ওয়ার্ডের বাচ্চাদের অসুস্থ মনে হচ্ছে। এ সময় বাচ্চাদের মায়েরা একই কথা বলেন। পরে দ্রুত তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। এ সময় দায়িত্বরত চিকিৎসকরা দুটি নবজাতককে ব্রট ডেড (আগেই মৃত) অবস্থায় পায়। বাকি চার নবজাতকও ক্রিটিক্যাল অবস্থায় ছিল। তাদের দ্রুত ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের আর বাঁচানো যায়নি।
একত্রে ছয় শিশুর মৃত্যুর কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, এ ঘটনা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর। পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড তিন ভাগে করা। ওই অংশে এই ছয় নবজাতক ছিল। অন্য কোনো ওয়ার্ডে এ ধরনের কিছু ঘটেনি। যেহেতু ওই রুমে কোনো ভেন্টিলেশন ছিল না, তাই হয়তো এসি বন্ধ রাখায় শ্বাসকষ্ট বা সাফোকেশনের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
এ ঘটনায় হাসপাতাল জুড়ে তৈরি হয়েছে শোকের পরিবেশ। স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। এক শিশুর দাদি অভিযোগ করেন, তার নাতনিকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি জানতে পারেন, শিশুটি আর বেঁচে নেই। রাতে ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও নার্স ছিলেন না। বাচ্চারা সারারাত কান্না করছিল এবং একে একে অসুস্থ হয়ে পড়ছিল।
সন্তান হারানো আরেক মা বলছেন, রাতে ওয়ার্ডের প্রায় সব শিশুই কান্না ও বমি করছিল। তারা কেউ বুঝতে পারেননি কী ঘটছে। সকালে শিশুর অবস্থা খারাপ হলে তাকে বাইরে নেওয়া হয়। পরে এনআইসিইউতে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা প্রথমে আশ্বস্ত করলেও কিছু সময়ের মধ্যেই শিশুটির মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়।
এদিকে, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এডিজিসহ ঊর্ধ্বতনরা।
এর আগে, ডিএমপির রমনা বিভাগের উপপুলিশ (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, আমরা খবর পেয়েছি, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে শিশুদের মৃত্যুর আসলে কী কারণ, তা আমরা এখনো জানি না। পুলিশ ঘটনাস্থলে রয়েছে। তদন্তের পর আসল তথ্য বলা যাবে।







