জুলাইয়ের মিছিল থেকে মর্গে, এখনো শহীদের স্বীকৃতি মেলেনি জীলানীর

আহমেদ জীলানী (ইনসেটে)।
২০ জুলাই। ২০২৪ সাল। দেশ জুড়ে তুঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলন। কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে পড়েছেন ছাত্র-জনতা। ছাত্র-জনতার উত্তাল মিছিলে অংশ নিতে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন আহমেদ জীলানী। অপেক্ষা করছেন পরিবারের সদস্যরা। সেই অপেক্ষা আর শেষ হয়নি। তিনি আর কোনোদিন ঘরে ফেরেননি। মর্গে মিলল আহমেদ জীলানীর মরদেহ। দাফন করা হয় রায়েরবাজার বধ্যভূমি কবরস্থানে।
স্বজনদের অভিযোগ, ডিএনএ নমুনা জমা দেওয়ার পরও এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে তার পরিচয় নিশ্চিত হয়নি। জুলাই আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া এই তরুণকে নিবন্ধিত শহীদের মর্যাদা দেওয়ার দাবি তাদের।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই দুপুরে বাসা থেকে বের হয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দেন আহমেদ জীলানী। পরিবারের কাছে আর ফিরে আসেননি। আন্দোলনের শেষ দিনগুলোতে তিনি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন।
তাদের দাবি, ৩ আগস্ট ২০২৪-এ সকালে বনানী কাঁচাবাজার এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে দুর্বৃত্তদের হামলায় আহমেদ জীলানী নিহত হন। বনানী থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
স্বজনদের ভাষ্য, মরদেহে গলার বাম পাশে কাটা দাগ এবং মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, আহমেদ জীলানীর চাচা ও আপন ভাইবোনের ডিএনএ নমুনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হলেও এখনো তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি এবং তিনি নিবন্ধিত শহীদের তালিকায় স্থান পাননি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবগত করা হয়েছে।
স্বজনদের তথ্যমতে, মরদেহ গ্রহণের জন্য কোনো স্বজনকে না পাওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুই সপ্তাহ পর মরদেহ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করে। পরে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট রায়েরবাজার বধ্যভূমি কবরস্থানে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
আহমেদ জীলানীর জন্ম সৌদি আরবের মদিনা মুনাওয়ারায়। তার পিতা ছিলেন পীরজাদা শাইখ মুহাম্মাদ গোলাম মুস্তাফা সাঈদী মাদানী। তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ১৯৬৮ সালে মদিনায় যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সাত ভাইবোনের মধ্যে আহমেদ জীলানী ছিলেন ষষ্ঠ।
তিনি সৌদি আরবের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৯ সালে বিলাল বিন রাবাহ বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক, ২০০৩ সালে সুহাইল বিন উমার বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ২০০৫ সালে কিং আব্দুল আজিজ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
২০০৭ সালে পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে বেড়াতে এসে তিনি একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকায় সৌদি আরবে আর ফিরে যেতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে বাবা-মায়ের মৃত্যুতে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
আহমেদ জীলানীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন তার মামা কাজী মুহাম্মদ বুরহান উদ্দিন। বললেন, ‘আহমেদ জীলানী মেধাবী, সাহসী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। সুস্থ হওয়ার পর আমার তত্ত্বাবধানে থাকতেন। স্থানীয় একটি মসজিদে নিয়মিত খেদমত করতেন, মাঝে মাঝে আজান দিতেন এবং ইমামতিও করতেন।’
আহমেদ জীলানী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার ঐতিহ্যবাহী আড়াইবাড়ী দরবার শরিফের প্রখ্যাত পীর গোলাম জীলানী রাহিমাহুল্লাহর নাতি। সৌদি আরবের মদিনা মুনাওয়ারার দাওয়াহ সেন্টারের বাংলা বিভাগের সাবেক পরিচালক শাইখ হাফিজ কাজী জাহিদ মাদানী রাহিমাহুল্লাহ তার মামা এবং আড়াইবাড়ী দরবার শরিফের প্রখ্যাত দাঈ শাইখ গোলাম সারওয়ার সাঈদী রাহিমাহুল্লাহ তার চাচা। এ ছাড়া ইসলামিক বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারী তার ভাগ্নির জামাতা— যোগ করেন কাজী বুরহান উদ্দিন।
আহমেদ জীলানীর পরিচয় শনাক্ত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিবন্ধিত শহীদের মর্যাদা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান মাসজিদ মুস্তাফা মাদানী কমপ্লেক্সের মোতোওয়াল্লি কাজী মুহাম্মদ বুরহান।
গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ অজ্ঞাতনামা ১১৪ জনের পরিচয় শনাক্তে মরদেহ উত্তোলনের কাজ শুরু হয়েছে। স্বজনদের সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে এই ১১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে মরদেহ উত্তোলনের কাজ শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
এ কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে ঢাকা জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা।
ওই সময় সিআইডিপ্রধান ছিবগাত উল্লাহ জানিয়েছিলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাদের অজ্ঞাতনামা মরদেহ আছে, তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সিআইডিতে আবেদন করলে তাদের নমুনাও নেওয়া হবে।







