মেলার মাঠ নিয়ে টানাটানি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইট-পাথরের নগরী রাজধানীতে বুকভরে শ্বাস নেওয়াই কঠিন। ফাঁকা জায়গা পাওয়া যেখানে আরও দুষ্কর, সেখানে আস্ত একটি মাঠ যেন সোনার হরিণ। কিন্তু শেরেবাংলা নগরে শুধু প্রচলিত মাঠই নয়, পড়ে রয়েছে ২৯ দশমিক ৭৯ একরের বিস্তীর্ণ প্রান্তর। যেন স্বপ্নে পাওয়া উপহার। হ্যাঁ, বলছি পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠের কথা। আগে জানুয়ারি এলেই মাসব্যাপী বসত বাণিজ্য মেলা। বছরের বাকি সময় উন্মুক্ত ময়দান। বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে স্থায়ী কেন্দ্রে সরে যাওয়ায় জায়গাটি এখন সারা বছরই থাকে ফাঁকা। সেই ভূমিতে নজর দুপক্ষের, মালিকানা নিয়ে শুরু হয়েছে টানাটানি।
মাঠটি বরাবরই দখলে রেখে সেখানে বাণিজ্য মেলার আয়োজন করত সরকার। তত্ত্বাবধান করছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাণিজ্য মেলা না বসায় হয়ে পড়েছিল একরকম অভিভাবকহীন। এই প্রান্তরে নিয়মিত খেলাধুলা করছে শিশু-কিশোররা। অনেক প্রশিক্ষক আবার শিক্ষার্থীদের শেখান গাড়ি চালানো। বসছে কিছু দোকানপাটও। এরই মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জায়গাটি নিজেদের দাবি করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) কর্তৃপক্ষ। দখল নিতে তারা টানিয়েছে সাইনবোর্ড।
সেটি দেখে টনক নড়েছে সরকারেরও। কিছুদিনের মধ্যে পাল্টা সাইনবোর্ড স্থাপন করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এমনকি সেখানে কেউ স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করলে তা দণ্ডনীয় হবে বলেও করেছে সতর্ক। তবে স্থানটিতে গবেষণাগার বানাতে অনড় শেকৃবি কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তৃতীয় আরেকটি ব্যানার সাঁটিয়েছেন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সাবেক শিক্ষার্থীরাও।
পুরো মাঠের মালিকানা দাবি করলেন শেকৃবির অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, এই জমির মালিক শেকৃবি। এতদিন বাণিজ্য মেলা হওয়ায় দাবি ছিল না বিশ্ববিদ্যালয়ের। এখন ফাঁকা হওয়ায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ সামলাতে সেটি প্রয়োজন। কারণ, শুরুর দিকে ফ্যাকাল্টি ছিল একটি, এখন চারটি। শিক্ষার্থীও বেড়ে হয়েছে ছয় হাজার থেকে সাত হাজার।
একই সুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার নজরুল ইসলামের গলায়। তার ভাষ্য, ‘একসময় খামারবাড়ি পর্যন্ত শেকৃবির ছিল। সেখানে গরুর খামার করেছিল বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্ট। এজন্যই জায়গাটির নাম খামারবাড়ি। শেরেবাংলা নগরের পুরো এলাকায় ৫০০ একর জমি ছিল, এখন কমতে কমতে ৮৭ একরে নেমেছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ সামলাতে জায়গাটি ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। তবে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
‘শেকৃবির জন্য জমি অধিগ্রহণের সময় পরিকল্পনা কমিশন ও মন্ত্রণালয়, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র ও বাণিজ্য মেলার মাঠ— পুরো এলাকাই ছিল এর আওতায়। কিন্তু সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ অন্য স্থাপনা তৈরি করায় মুখ খোলেনি প্রতিষ্ঠানটি। মাঠটি ফাঁকা পড়ে থাকায় সময় এসেছে দখলে নেওয়ার’— যুক্তি দিলেন তারা।
এর মধ্যে জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ পেতে বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, চলতি বছরই ঢাকা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে করা হয়েছে আবেদন। সম্প্রতি তারা মাঠটি পরিদর্শনও করেছে। এ ছাড়া জমিটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর এতদিন দেখাশোনা করলেও তারা মালিক নয়।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড টানালেও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে নারাজ সচিব নজরুল ইসলাম। তবে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের দাবি, ‘এটা আমাদের জমি। শেকৃবি চাইলেই তো আর হবে না। এটার মালিক সরকার। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’
এরই মধ্যে মাঠের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানালেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। ‘এটা সরকারের জায়গা। কয়েক দিন আগে একনেকে এই মাঠে সচিবালয় নির্মাণ করার জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেটা হলে তো কোনো কথাই থাকবে না’— আগামীর সময়কে তথ্য দিলেন তিনি।
এদিকে সরেজমিন দেখা যায়, মাঠের একাংশে বৃক্ষমেলার প্রস্তুতি চলছে। বেশিরভাগ অংশই ফাঁকা। সকাল-বিকাল খেলায় মেতে উঠেছে শিশু-কিশোররা। গাড়ি চালানো শিখতেও দেখা গেল অনেককে।
মাঠেই কথা হলো রুবেল হোসেন, কালাম, রহমতসহ বিভিন্ন বয়সের কয়েক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তাদের ভাষ্য, এই মাঠ কারও দখলে দেওয়া উচিত নয়। এমনকি এখানে যেন না হয় কোনো স্থাপনাও। ঢাকায় এরকম ফাঁকা মাঠ পাওয়াটা সৌভাগ্যের। মাঠের অভাবে ঠিকমতো করা যায় না খোলাধুলা। সরকার যেন শিশু-কিশোরদের সুস্থ মানসিক বিকাশের স্বার্থে জমিটিকে উন্মুক্ত মাঠ হিসেবে উন্নত করে দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের শুরুর দিকে লুই আই কানের নকশা মেনে বর্তমান সচিবালয় স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৈরি করা হয়েছিল একটি প্রকল্পও। কিন্তু বিশাল ব্যয়সহ নানা বিষয় চিন্তা করে সিদ্ধান্ত বদলায় সরকার। আবার ওই সরকারের শেষ দিকে সেখানে পার্ক তৈরির প্রকল্প নিয়েছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কিন্তু নকশা পছন্দ না হওয়ায় সেটি অনুমোদন না দিয়ে তৈরি করতে বলা হয়েছিল লন্ডনের হাইড পার্কের মতো একটি উন্মুক্ত পার্ক।





