দেশে হেড-নেক ক্যানসারে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশের বেশি

সংগৃহীত ছবি
বিশ্ব জুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব হেড-নেক ক্যানসার দিবস’। দিবসটি উপলক্ষে আজ সোমবার বাংলাদেশেও রোগটির প্রাথমিক শনাক্তকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসাসেবা আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অসচেতনতা ও দেরিতে চিকিৎসা শুরুর কারণে দেশে এই ক্যানসারে আক্রান্তদের ৫০ শতাংশের বেশি মারা যান, যা বর্তমানে দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব হেড নেক অনকোলজিক সোসাইটিজ’ (আইএফএইচএনওএস) মূলত মুখের ভেতর, নাক, কান, গলা ও থাইরয়েডের ক্যানসারের লক্ষণ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করতে নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং নাক-কান-গলা, অনকোলজি ও ডেন্টাল বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বিত কার্যক্রমে জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি ২০২৬ সাল থেকে এ দিবসটি কেন্দ্র করে দেশব্যাপী বিশেষ ‘সচেতনতা সপ্তাহ’ পালনেরও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে ক্যানসারের সামগ্রিক ঝুঁকির মধ্যে একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে হেড-নেক ক্যানসার। তবে সচেতনতার অভাবে দেশের অধিকাংশ রোগী রোগটির একদম শেষ পর্যায়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখে বা জিহ্বায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে নিরাময় না হওয়া ঘা, কোনো কিছু গিলতে কষ্ট হওয়া, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন কিংবা ঘাড়ের যেকোনো অংশে চাকা বা ফোলা ভাব— এসবই হেড-নেক ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ। রোগীরা এসব উপসর্গকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করায় শেষ মুহূর্তে আর উন্নত চিকিৎসা দিয়েও জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয় না।
এর পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে তামাকজাত দ্রব্যের যথেচ্ছ ব্যবহারকে দায়ী করছেন চিকিৎসকেরা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ধোঁয়ামুক্ত তামাক অর্থাৎ জর্দা, গুল, সাদাপাতা এবং জর্দাযুক্ত পানের ব্যবহারের হার অত্যন্ত বেশি। ধূমপান ও এসব তামাকজাত পণ্যের অতিরিক্ত ব্যবহারই দেশে হেড-নেক ক্যানসারের বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণে জোর
চিকিৎসকদের মতে, প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হেড-নেক ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব—যদি ধূমপান, পানের সঙ্গে জর্দা ও সাদাপাতা ব্যবহার এবং মদ্যপানের অভ্যাস বর্জন করা যায়। তবে শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের রোগীরা সময়মতো স্ক্রিনিং বা উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পান না। এই বৈষম্য দূর করতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্ক্রিনিং ক্যাম্প এবং ডেন্টাল চেক-আপের মাধ্যমে প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
দিবসটি উপলক্ষে ঢাকার জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট এবং সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্ণাঢ্য র্যালি, সেমিনার ও বিনামূল্যে স্ক্রিনিং ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বছরব্যাপী সুনির্দিষ্ট প্রচারণা বা ‘কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি’র মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন।
দিবসটির প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক উদ্যোগ
২০১৪ সালের ২৭ জুলাই নিউইয়র্কে অলাভজনক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব হেড নেক অনকোলজিক সোসাইটিজ’ (আইএফএইচএনওএস)-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালন শুরু হয়। সংস্থাটি বিশ্বের ৫৫টি দেশের হেড-নেক ক্যান্সার সোসাইটির সম্মিলিত একটি প্ল্যাটফর্ম। ২০১৬ সাল থেকে সংস্থাটি নিয়মিত দিবসটি পালন করে আসছে এবং চলতি বছর থেকে সপ্তাহব্যাপী সচেতনতা কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ বছরের বৈশ্বিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে চিকিৎসকদের জন্য ‘৬০ সেকেন্ডের পরীক্ষা’ এবং বিশ্বজুড়ে রোগীদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য ‘রোগীর কণ্ঠস্বর প্রাচীর’ নামে দুটি বিশেষ ডিজিটাল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ক্যান্সারের চিত্র ও চিকিৎসা সংকট
বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ ক্যান্সার রোগী রয়েছে এবং প্রতি বছর আনুমানিক ২ লাখ মানুষ নতুন করে এতে আক্রান্ত হন। দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ মানুষ ক্যান্সারে মারা যান, যা দিনে গড়ে ২৭৩ জন।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০১৫-২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের ক্ষেত্রে ফুসফুসের পরেই শীর্ষ ক্যান্সারগুলোর মধ্যে রয়েছে মুখগহ্বর, গলনালী ও সংলগ্ন অঙ্গের ক্যান্সার। এছাড়া দেশের নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগগুলোতে প্রতি বছর প্রায় ২২ শত থেকে ২৫ শত রোগী থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে আসেন। সামগ্রিক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে হেড-নেক ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
দেশে এই রোগের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তীব্র সংকট রয়েছে। বিশ্বমানের জটিল হেড-নেক অস্ত্রোপচারের জন্য পুরো দেশে মাত্র ২৫ জন বিশেষজ্ঞ সার্জন রয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত ভিড় ও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে অনেক সময় চিকিৎসা শুরু করতেই দেরি হয়ে যায়। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার ও রেডিওথেরাপির খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
অবশ্য সংকটের মধ্যেও দেশের ক্যান্সার চিকিৎসায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া দেশের আটটি বিভাগে ১,৪০০ শয্যা বিশিষ্ট বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ২০১০ সাল থেকে স্বল্প খরচে চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের উচ্চতর ফেলোশিপ চালু হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, ক্যান্সার দূরীকরণে প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। ধূমপান, পান-জর্দা, অ্যালকোহল ও অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার বর্জন এবং ফলমূল ও শাকসবজি গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা। একইসঙ্গে গলা ফোলা, মুখে ঘা, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন বা খাবার গিলতে কষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।




