পুনর্বাসনে ৪২৬ কোটির প্রকল্প
পথশিশুদের পাতে পরামর্শকের থাবা
- কারিগরি বা জটিল কাজ না থাকলেও পরামর্শে ৭ কোটির প্রস্তাব
- আউটসোর্সিং জনবলে ৬১ কোটি ৩৯ লাখ খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন
- ভাড়া গাড়ির বদলে নতুন গাড়ি কিনতে চাওয়া হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ টাকা

সংগৃহীত ছবি
কাগজে-কলমে মানবতার বড় আয়োজন। লক্ষ্য— পথশিশুদের নিরাপদ আশ্রয় আর সুন্দর ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই মহৎ উদ্যোগের শুরুতেই অহেতুক বিপুল ব্যয়ের ফিরিস্তি। ‘পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন সুবিধাসহ পুনর্বাসন’ নামের প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকারও বেশি, যা বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। কিন্তু কারিগরি বা জটিল কোনো কাজ না থাকলেও শুধু পরামর্শক খাতেই চাওয়া হয়েছে ৭ কোটি টাকা। এতে চোখ কপালে উঠেছে পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্টদের। প্রকল্পটিতে শুধু পরামর্শক খাতই নয়, বিতর্ক উঠেছে আরও নানান খরচ নিয়ে। এরই মধ্যে আগামীকাল রবিবার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় উঠছে এই প্রকল্প।
পথশিশু পুনর্বাসনের এই প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২৬ কোটি ২৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। এটি বাস্তবায়ন করা হবে দেশের ৮ বিভাগের ৩১ জেলার ১২ সিটি করপোরেশন এলাকায়। রবিবারের পিইসি সভায় সভাপতিত্ব করবেন আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) মো. এহসানুল হক। জানা গেছে, সেখানে পরামর্শক খাতে প্রস্তাবিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা, পরামর্শকের ধরন এবং প্রস্তাবের ব্যয় নির্ধারণের ভিত্তি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হবে। পাশাপাশি আরও নানা ব্যয় নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়বেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। সব প্রক্রিয়াকরণ শেষে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পেলে তা বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। চলতি বছর শুরু করে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
জানতে চাইলে মো. এহসানুল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিষয়টি আমার বিভাগ প্রধানের (অতিরিক্ত সচিব ড. শাহ মো. হেলাল উদ্দিন) তত্ত্বাবধানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এখনো আমার পর্যন্ত আসেনি। তবে এটুকু বলতে পারি, প্রধানমন্ত্রী এরকম অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পছন্দ করেন না। আমরাও চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে যৌক্তিকতা নির্ধারণের। এ প্রকল্পে যদি প্রকৃত অর্থেই পরামর্শকের প্রয়োজন থাকে, তাহলে সেটি আলাদা বিষয়। আর যদি প্রয়োজন না থাকে, তাহলে পিইসি সভায় সে অনুযায়ী সুপারিশ দেওয়া হবে।’
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সার্বিক উন্নয়ন এবং সমাজের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তের উদ্দেশ্যে এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ৬ হাজার ৬০০ শিশুকে পরিবারে এবং সমাজে পুনঃএকত্রীকরণ বা হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পথশিশু বা ঝুঁকিতে থাকা ১ হাজার ৯০০ জন শিশুকে আশ্রয় দেওয়াসহ সাড়ে ৪ হাজার শিশুকে আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় আনা হবে। এক্ষেত্রে ১৫০টি উন্মুক্ত পথশিশু স্কুল স্থাপন করা হবে প্রকল্পের আওতায়। স্কুলপ্রতি গড়ে ৩০ শিশুকে আনা হবে শিক্ষার আওতায়।
প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রমগুলো হলো— কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা পথশিশুদের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত এবং ৫ হাজার ৭০০ পথশিশুকে স্বাবলম্বী করতে আর্থিক সহায়তা। এ ছাড়া ৫ হাজার ৫০০ শিশুর পরিবারকে কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফারের (শর্তসাপেক্ষে নগদ অর্থ) ব্যবস্থা করা হবে। প্রকল্প মেয়াদে ৬ হাজার ৬০০ শিশুকে পরিবারের নিকটাত্মীয়ের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে ৫ হাজার ৫০০ শিশু পরিবারকে মাসিক ১ হাজার টাকা হারে ৬০ মাস মেয়াদে দেওয়া হবে উপবৃত্তি। এ ছাড়া বছরে ১ হাজার ১৪০ জন করে ৫ হাজর ৭০০ শিশুকে স্বাবলম্বী করতে দেওয়া হবে এককালীন আর্থিক সহায়তা।
যদিও পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, ‘এরই মধ্যে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ব্যয় নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সেসব বিষয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছে পিইসি সভায় জবাব চাওয়া হবে।’
এমন প্রকল্পে পরামর্শক খাতে এত বেশি ব্যয় প্রস্তাব নিশ্চিতভাবেই অপচয় বলে মনে করেন সরকারের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন। আগামীর সময়কে বললেন, ‘কেননা সাধারণত বৈদেশিক ঋণের প্রকল্পের চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পরামর্শক সেবা নিতে হয় বাধ্য হয়েই। আবার কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে পরামর্শক লাগে। কিন্তু প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের কার্যক্রমের সঙ্গে পরামর্শক সেবা যায় না। বরং এই টাকা দিয়ে পথশিশুদের কল্যাণেই কিছু করা যায় কি না, সেটি ভেবে দেখা যেতে পারে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘পরামর্শকের নামে অনেক সময় প্রকল্পে বিভিন্ন লোকবল নিয়োগ দিয়ে মোটা অঙ্কের বেতন দেওয়া হয়। পরে তারা খুব বেশি ইফেকটিভ (কার্যকর) কোনো কাজ করতে পারেন না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।’
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানালেন, এই প্রকল্পে প্রশ্নের মুখে পড়তে যাওয়া অন্যান্য প্রস্তাবিত ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে আউটসোর্সিং জনবলের জন্য ৬১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হবে পিইসি সভায়। এ ছাড়া কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, অফিস সরঞ্জাম, আসবাব, বইপত্র, ব্যবহার্য দ্রব্য, মনিহারি, ক্রীড়া সামগ্রী, বিছানাপত্র, পোশাক ইত্যাদির ব্যয় বাজারদর যাচাই কমিটির মাধ্যমে পরিপত্র অনুযায়ী যাচাই করা হয়েছে কি না, সেসব নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়বেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি প্রকল্পে একটি জিপ ও একটি মাইক্রোবাস বাবদ ১ কোটি ১ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পরিবর্তে ভাড়া গাড়ির সংস্থান রাখার সুপারিশ দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি মেরামত ব্যয় (মোটরযান, আসবাব, কম্পিউটার, অফিস সরঞ্জামাদি, আবাসিক ভবন, অনাবাসিক ভবন) বাবদ ধরা হয়েছে ২ কোটি ৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা। এই ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি, যৌক্তিকতাসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। এ ছাড়া চিকিৎসা ব্যয়, অনুদান বাবদ ব্যয়, গবেষণা বাবদ ব্যয়, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ, ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং প্রচার ও বিজ্ঞাপন বাবদ ব্যয় নির্ধারণের ভিত্তি-যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। যৌক্তিকতা জানতে চাওয়া হবে টেলিফোন বাবদ প্রস্তাবিত ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়েরও।



