প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাভ কতটা বাস্তব!
- বিনিয়োগ, রপ্তানি, শ্রমবাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নে সম্ভাবনা
- সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তব ফল নিশ্চিত করা

ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাঁচ দিনের নিউ ইয়র্ক সফরে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বনেতা, জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, জনশক্তি রপ্তানি, জলবায়ু অর্থায়ন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন প্রশ্ন— নিউ ইয়র্কের এসব আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ১১টি দেশের সঙ্গে ছিল দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। তবে সফরের মূল্যায়ন শুধু বৈঠকের সংখ্যা দিয়ে করার সুযোগ নেই। আলোচনার টেবিল থেকে কতটা বিনিয়োগ আসে, নতুন বাজার তৈরি হয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়— সেটিই হবে মূল হিসাব।
এলডিসি উত্তরণে বড় পরীক্ষা
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলোর একটি হলো এলডিসি থেকে উত্তরণ। জাতিসংঘের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের কথা রয়েছে। উত্তরণের পর বর্তমানে পাওয়া কিছু বিশেষ বাণিজ্য সুবিধায় পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে রপ্তানি খাতকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কসুবিধা কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে। তাই নতুন বাণিজ্য চুক্তি, বাজার বৈচিত্র্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগে আগ্রহ, বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ
সফরে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও ডিজিটাল খাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহ আর বাস্তব বিনিয়োগ এক বিষয় নয়। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগ সুরক্ষা, অর্থ স্থানান্তর এবং মুনাফা ফেরত নেওয়ার সুযোগ দেখতে চান। ফলে নিউ ইয়র্কে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে প্রকল্প, চুক্তি ও বাস্তব মূলধনে পরিণত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
শ্রমবাজারেও নতুন সুযোগ
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
নতুন শ্রমবাজার মানে শুধু কর্মসংস্থান নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রেমিট্যান্স। তবে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে শুধু বেশি কর্মী পাঠানো যথেষ্ট হবে না। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। তাই উচ্চ আয়ের পেশায় বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ বাড়ানোই হবে বড় সুযোগ।
জলবায়ু ও রোহিঙ্গা সংকটেও অর্থের হিসাব
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের মঞ্চে জলবায়ু অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে শরণার্থীদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তার ব্যয়ের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের ওপর পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশ বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শ্রমবাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। এখন সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়। কত বিনিয়োগ আসে, কত নতুন বাজার তৈরি হয়, রপ্তানি সুবিধা কতটা ধরে রাখা যায় এবং কতটা দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়— এসবের ওপরই নির্ভর করবে সফরের প্রকৃত অর্থনৈতিক ফল।



