ফিরছে পুরনো আমলের মানহানি!
- দুই মাসের মাথায় সংশোধন হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন
- অপব্যবহার হবে না— নিশ্চয়তা সরকারকেই দিতে হবে: মনজিল মোরসেদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুই মাসের মাথায় সংশোধন হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬। এর খসড়ায় আওয়ামী আমলের ‘মানহানিকর তথ্য’ বা মানহানির বিষয়টি যোগ করা হয়েছে। জাতিসংঘ ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার অনুরোধে সেটি বাদ দিয়ে অধ্যাদেশ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তা হুবহু বিল আকারে জাতীয় সংসদে তোলা হয়। পাস হয় গত ১০ এপ্রিল। এত অল্প সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ায় নানা শঙ্কার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নতুন বিধানটির অপব্যবহার হতে পারে। খর্ব হতে পারে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।
সংশোধনী খসড়ায় উল্লেখ আছে, সাইবার স্পেসে গুজব, অপতথ্য ও মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। আর জড়িত ব্যক্তির সাত বছরের জেল বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করা যাবে। ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন-২০২৬’ শিরোনামের খসড়াটি চূড়ান্ত করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। এখন এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন সরকারের আইন বিশেষজ্ঞরা। ‘সবুজ সংকেত’ মিললেই অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
খসড়ায় মানহানির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘পেনাল কোড ১৮৬০-এর সেকশন-৪৯৯ এ বর্ণিত মানহানি এবং কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে স্থিরচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল চিত্র বা গ্রাফিক্সের মাধ্যমে অথবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অন্য কোনো উপায়ে ধারণকৃত, নির্মিত বা সম্পাদিত এবং প্রদর্শনযোগ্য বা শ্রবণযোগ্য কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা ক্ষতিকর উপস্থাপনাও ‘মানহানি’র অন্তর্ভুক্ত হইবে।’ এর যৌক্তিকতার ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে, এআই সৃষ্ট বিভ্রান্তি, অপমান ও অপদস্থকর, বিরক্তিকর এবং হেয়প্রতিপন্ন হয়— এমন কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এটি বন্ধ করতে সংজ্ঞাটি যুগোপযোগী ও স্পষ্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রস্তাব আছে কয়েকটি অপরাধের শাস্তি বাড়ানোর।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বৃহস্পতিবার আগামীর সময়কে বললেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে মানহানির বিষয়টি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ও দেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এর বাতিল চেয়েছিল। বিএনপি দল হিসেবে একই দাবি করেছিল। এখন যদি তারাই বিষয়টি ফেরত আনে, তা উচিত হবে না। দুই মাস আগে পাস হওয়া আইন কেন দ্রুত সংশোধন করতে হবে? সম্প্রতি প্রধান রাজনীতিবিদদের মানহানি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট ছাড়া হয়েছে। হয়তো এগুলো রোধেই আইন সংশোধন করা হতে পারে। বাংলাদেশে যেকোনো আইনই অপব্যবহার হয়। মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে কথা বললেই এসব আইনের অপব্যবহার হতো। সে কারণেই তা বাতিল করা হয়েছিল। নতুন করে ওই ধারা ফেরত আনলে অপব্যবহার হবে না, তার নিশ্চয়তা সরকারকেই দিতে হবে।’
গত বুধবার বিষয়টি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সেখানে অনেকেই মানহানির বিষয়টি নিয়ে নানা মত দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, অপতথ্য ও গুজব শব্দ যোগ করা হলে কোনটি অপতথ্য, কোনটি গুজব, তা নিয়ে অপব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে। হয়রানির শিকার হতে পারে মানুষ। আর মানহানি সাধারণত ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-তে মানহানির অপরাধ ও দণ্ডের বিধান থাকায় জাতিসংঘের হাই কমিশনস ফর হিউম্যান রাইটসের আপত্তির কারণে ২০২৩ সালে মানহানির সাজা কমানো হয়েছিল। তারপর ওই বিধান বাদ দিতে দেশি ও বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনুরোধ জানালে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং পরে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ মানহানি-সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড বাদ দেওয়া হয়। নতুন করে এটি যোগ হলে দেশে-বিদেশে নেতিবাচক সমালোচনা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় সভায়।
সম্প্রতি (৮ জুন) জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হেলেন জেরিন খানের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন করা হবে। একই সঙ্গে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করার বিধানও আইনে যোগ করা হচ্ছে। গুজব, অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্ট নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধানও আইনে যোগ করা হবে।’
ওই দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি, বট নেটওয়ার্ক, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট, নারী ও শিশুদের অনলাইনে হয়রানি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিষয়টি সংসদে উঠিয়েছিলেন হেলেন জেরিন খান। বলেছিলেন, ‘বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে ভুয়া পরিচয়ে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট ও পেজ পরিচালিত হচ্ছে। সংগঠিত বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও এবং অডিও তৈরি করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চলছে।’
এর আগে সাইবার সুরক্ষা আইনটি চারবার কাটাছেঁড়া হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ নামে গেজেট করা হয়। এর অন্তত পাঁচ বছর পর ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ নামে সংশোধন করে সরকার। শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ রহিত করে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি আইন আকারে পাস হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য ছড়ানো ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির সংখ্যা বাড়লেও বর্তমান আইনে এ ধরনের অপরাধের শাস্তির বিধান নেই। এ কারণে এসব অপরাধ বন্ধ করা যাচ্ছে না।




