ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন
আ. লীগের পতনে নির্বাচনী লড়াইয়ে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত
- নির্বাচনে ৮ স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণ
- নেই আ. লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা

সংগৃহীত ছবি
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের জোটেও ঘটেছে ছন্দপতন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে জোটবদ্ধ হয়ে এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বিএনপি ও জামায়াত পন্থী আইনজীবীরা। এবার সেই প্রথার ব্যত্যয় ঘটিয়ে আলাদা প্যানেলে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তারা।
আজ বুধবার ও আগামী বৃহস্পতিবার এই ভোট যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা আইনজীবী সমিতির ২০২৬-২৭ কার্যকরী কমিটির নির্বাচনে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ২৩টি পদে ভোট গ্রহণ চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। তবে বেলা ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত থাকবে বিরতি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল (নীল প্যানেল) এবং জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য পরিষদ (সবুজ প্যানেলে) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদ সমর্থিত আইনজীবীরা। উভয় প্যানেলে ২৩ জন করে মোট ৪৬ জন ছাড়াও বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র আটজন প্রার্থী। এতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন ২১ হাজার ৭৩১ আইনজীবী।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ মেয়াদে সর্বশেষ ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ২১টি পদে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আদালতে আসা বন্ধ করে দেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচিতরা। এতে সমিতির সব কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এই পরিস্থিতিতে একই বছরের ১৩ আগস্ট অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা। এরপর থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তারা। এই কমিটি নির্বাচন পরিচালনায় গঠন করে কমিশন। পরবর্তীতে গত ২৯ মার্চ তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো. বোরহান উদ্দিন। তফসিল অনুযায়ী, দুটি প্যানেলে ২৩ জন করে মোট ৪৬ জন ছাড়াও আটজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জমা দেন মনোনয়ন পত্র।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১৬ আইনজীবী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ দেখালেও অনুমতি না পাওয়ায় অংশ নিতে পারেননি বলে রয়েছে অভিযোগ। নির্বাচনের বাইরে রাখতেই তাদের মনোনয়ন পত্র দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচনী প্যানেল
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য নীল প্যানেল থেকে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মোহাম্মদ আবুল কালাম খান। প্যানেলের অন্য প্রার্থীরা হলেন—সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. রেজাউল করিম চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান (আনিস), সিনিয়র সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. এলতুতমিশ সওদাগর (অ্যানি), সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মাহাদী হাসান জুয়েল, লাইব্রেরি সম্পাদক খন্দকার মাকসুদুল হাসান (সবুজ), সাংস্কৃতিক সম্পাদক মারজিয়া হীরা, অফিস সম্পাদক মো. আফজাল হোসেন মৃধা, ক্রীড়া সম্পাদক মো. সোহেল খান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক এ এস এম ফিরোজ এবং তথ্য ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে শফিকুল ইসলাম (শফিক)।
সদস্য পদে এই প্যানেল থেকে লড়ছেন—এ এইচ এম রেজওয়ানুল সাঈদ (রোমিও), ফারজানা ইয়াসমিন, মো. আদনান রহমান, মো. নিজাম উদ্দিন, মো. নজরুল ইসলাম (মামুন), মো. সানাউল, মামুন মিয়া, মুজাহিদুল ইসলাম (সায়েম), শেখ শওকত হোসেন এবং সৈয়দ সারোয়ার আলম (নিশান)।
অপর দিকে সভাপতি পদে এস এম কামাল উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মো. আবু বাক্কার সিদ্দিক লড়ছেন জামায়াত-এনসিপি সমর্থিত ১১ জোটের সবুজ প্যানেল থেকে। এই প্যানেলের অন্য প্রার্থীরা হলেন—সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. শাহিদুল ইসলাম, সহ-সভাপতি মো. লুৎফর রহমান (আজাদ), কোষাধ্যক্ষ মো. আজমত হোসেন, সিনিয়র সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. শাহীন আক্তার, সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া, লাইব্রেরি সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার, অফিস সম্পাদক মো. আবদুর রাজ্জাক, ক্রীড়া সম্পাদক বাবুল আক্তার (বাবু), সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান মোল্লা এবং তথ্য ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ।
সদস্য পদে এই প্যানেলের প্রার্থীরা হলেন—বেলাল হোসেন, দিলরুবা আক্তার (সুবর্ণা), জহিরুল ইসলাম, কাওসার আহমেদ, মো. কাইয়ুম হোসেন (নয়ন), মো. মহসিন (রেজা), মো. ওমর ফারুক, মো. শাহ আলম, মো. ইউনুস এবং মোশাররফ হোসেন।
এছাড়া সভাপতি পদে মোহাম্মদ ইউনুস আলী বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক পদে বলাই চন্দ্র দেব ও মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, কোষাধ্যক্ষ পদে রফিকুল ইসলাম, সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে দেওয়ান আবুল হোসেন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ওলিদা বেগম, অফিস সম্পাদক পদে জাকির হোসেন ও একজন সদস্য পদে নির্বাচন করছেন স্বতন্ত্র হিসেবে।
এ বিষয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো. বোরহান উদ্দিন বললেন, ‘প্রার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন নির্বাচনে। কারো বিরুদ্ধে নেই কোন অভিযোগ। প্রত্যাশা করছি, আইনজীবীরা ভোট দবেন উৎসবমুখর পরিবেশে। ভোট গ্রহণ করা হবে ১৮০টি বুথে; ফলে বাড়বে ভোট দেওয়ার গতি। ভোট গ্রহণ শেষে শুক্রবার মেশিনে সদস্যদের এবং সম্পাদকীয় পদে হাতে ভোট গণনা শেষ ফলাফল ঘোষণা করা হবে।’
নীল প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী আইনজীবী কামাল খান জানালেন, ‘ঢাকা বারের নির্বাচন কোন দলীয় নির্বাচন নয়। এটা আইনজীবীদের নির্বাচন। আইনজীবীদের স্বার্থে কাজ করেছি। তারা আমাকে সমর্থন করবে বলে আশাবাদী।’
সবুজ প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী আইনজীবী এস এম কামাল উদ্দীন বললেন, ‘আসলে ভোটারদের কাছে দৌঁড়েছি। কমিশন গঠনে হয়েছে বৈষম্য। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাঠ সমতল হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু আমরা তো একসঙ্গেই ছিলাম। এখন পরিস্থিতিগত কারণে আলাদা প্যানেলে নির্বাচন করছি। নির্বাচনে মব সৃষ্টি করে যাতে কোন বিশৃঙ্খলা না হয় সেই বিষয়ে জানিয়েছি কমিশনক।‘
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নজরুল জানালেন, ‘দেশের চরম সংকটে নিয়েছিলাম সমিতির দায়িত্ব। কাজ করেছি সাধারণ আইনজীবীদের স্বার্থ রক্ষায়। ইতোপূর্বে আওয়ামী লীগের আমলে বৈষম্যের শিকার হয়েছিল আইনজীবীরা। এখন বৈষম্যের শিকার হবে না কেউ।’
আগামী ৭ মে নির্বাচিতদের হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করলেন এ আইনজীবী।



