নারী নির্মাণশ্রমিকদের ভাঙাচোরা জীবন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জানু বেগম, পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী। ঢাকার এক নির্মাণশ্রমিক। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ভূমিকা রাখেন অন্যের ভবন নির্মাণে। কিন্তু তার জীবনটাই চলছে নানা চড়াই-উতরাই আর ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে, ৩২ বছরে বিচ্ছেদ। ২০ বছরের দাম্পত্য জীবনে ৯ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। অসুখ-বিসুখে মরেছে তার সাতটিই। এখন বেঁচে থাকা দুই মেয়েকে নিয়ে চলছে তার সংগ্রামের জীবন।
জীবন নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই জানু বেগমের। কর্মক্ষেত্রের নিত্য হয়রানি এখন গায়ে লাগে না তার। বেঁচে থাকাকেই এখন সৌভাগ্য মানেন তিনি।
গত সোমবার খিলগাঁওয়ের এক নির্মাণাধীন ভবনের নবমতলায় কাজ করছিলেন জানু বেগম। সেখানেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গে কথা হয় আগামীর সময়ের। তপ্ত দুপুরে হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের দুর্দশাগ্রস্ত জীবনের দুঃখগাঁথা শোনালেন তিনি।
জানু বেগম জানালেন, ২০ বছরের সংসার টেকেনি স্বামীর নির্যাতনে। এক সময় আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১০ সালে স্বামীকে তালাক দিয়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা থেকে দুই মেয়েকে নিয়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। নিজের আয়ে বড় করার সিদ্ধান্ত নেন মেয়েদের। নাম লেখালেন নারী নির্মাণশ্রমিকের খাতায়। এরপর থেকে চলছে তার জীবনযুদ্ধ।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে তার সঙ্গে কথা হলো কর্মপরিবশে নিয়ে। সে সময় তার গলায় ছিল অভিমান আর আক্ষেপের সুর, ‘কীসের কর্মপরিবেশ? বেঁচে আছি এটাই সৌভাগ্য। এই যে ৯ তলার ওপর কাজ করছি, কিন্তু কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। ভয় ও আশঙ্কা নিয়েই কাজ করছি।’
কাজের ফাঁকে খাওয়ার সময় পান না ভালো পানিও। রুচি না হলেও পান করতে হচ্ছে ময়লাযুক্ত ট্যাংকির পানি। তার পাশেই পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ভ্রাম্যমাণ টয়লেট। নারী-পুরুষ শ্রমিকদের জন্য ওই একটি।
জানু বেগমের অভিযোগ, একটু পরিষ্কার পানির জন্য দফায় দফায় মানববন্ধন করেও কোনো সুরাহা হয়নি। উল্টো বিশ্রামে বসলেই কাজ থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেন ঠিকাদার কিংবা মালিক।
জানু জানালেন, তার শরীর বেশ খারাপ। কিন্তু ওষুধ কেনার টাকা নেই। কাজ না করলে ওষুধও কিনতে পারবেন না। তাই নোংরা পানি খেয়েই কাজ করছেন তিনি।
আলাপের এক পর্যায়ে কথা উঠল মজুরি নিয়ে। জানালেন, সারা দিন কাজ করে পান ৪৫০ টাকা; যা একজন পুরুষ শ্রমিকের মজুরির চেয়ে অনেক অনেক কম। জানু আক্ষেপ করলেন, ‘এই টাকা দিয়ে কীসের বাসা ভাড়া, কীসের হাটবাজার, কীসের চিকিৎসা? কেমনে বাঁচুম কন? এটা বাড়ানোর জন্য শ্রমিকরা মিলে কত আন্দোলন করলাম, বাড়াতে পারলাম না। আমাদের সমস্যা মালিক ও কোম্পানিরাও বোঝে না।’
নারী শ্রমিকদের আর কোনো সমস্যায় পড়তে হয় কি না? এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকলেন জানু। পরে মুখ খুললেন, ‘সত্যি কথা বলতে নারীকে খারাপ প্রস্তাব দেয় ঠিকাদাররা; রাজি না হলে অনেক সময় কাজ থেকে বাদও দেয়। আবার এই প্রস্তাবে রাজি করার জন্য বাড়তি টাকার প্রস্তাবও দেয়।’
জানুর অভিযোগের সত্যতা আছে বলে দাবি করলেন ইমারত নির্মাণশ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব) কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সায়েরা খাতুন। তার ভাষ্য, নারী শ্রমিকদের শ্লীলতাহানি ও কুপ্রস্তাবের ঘটনা নিত্যদিনের। কেউ কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেন তাদের কাছে। তাদের বিষয়ে আইন সালিশ কেন্দ্রের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আবার অনেকে লজ্জায় কিংবা চাকরি হারানোর ভয়ে সব সহ্য করেন নীরবে।
কর্মক্ষেত্রে কাজের পরিবেশ আগের চেয়ে ভয়াবহ উল্লেখ করে সায়েরা খাতুন জানালেন, শুধু দুর্ঘটনায় যেটা মারা যাচ্ছে সেটা দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ময়লাযুক্ত পানি খেয়ে রোগে আক্রান্ত হয়েও অনেকে মারা যাচ্ছে। তাদের হিসাব করছে না।
ইনসাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি আজিজ হোসেন জানালেন, সারা দেশে প্রায় ১ কোটি ৮৬ লাখ নারী শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার কোনো লেশ মাত্র নেই।
তার অভিযোগ, ‘এটি হওয়ার কারণ হলো— এ বিষয়ে তদারকি নেই। নিরাপত্তা পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের। সেই দায়িত্ব যথাযথ পালন করছে না প্রতিষ্ঠানটি।’
‘স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি ও সুয়েয় পানি মালিকদের নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু কিছুই দিচ্ছে না। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের জন্য আইন করেছে, সেটাও মানছেন না মালিকরা। এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী দেয় না। ফলে মৃত্যু হচ্ছে শ্রমিকদের। শ্রমিকদের মৃত্যুটা যেন মনে হয় পাখির মৃত্যুর মতো। কোনো জবাবদিহি নেই।’
‘শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিক মারা গেলে ২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানেও গড়িমসি করেন মালিকরা’, যোগ করলেন আজিজ হোসেন।
ইনসাবের এই নেতার অভিযোগ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২০১৭ সালে মালিক, শ্রমিক ও সরকার মিলে একটি শক্ত নীতিমালা তৈরির কথা ছিল। সেটিও সরকারের গাফিলতির কারণে আলোর মুখ দেখেনি। ফলে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ থেকে যাচ্ছে অন্ধকারেই।
জানু বেগমদের মতো নারীদের কাছে তাই বেঁচে থাকাটাই পরম সৌভাগ্যের।



