স্বাধীন বিচার বিভাগে উল্টো পথে সরকার

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা— বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুবার উচ্চারিত একটি প্রতিশ্রুতির নাম। নির্বাচনের আগে মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে জোর দিয়ে বলেছিল বিএনপি, তার অন্যতম ছিল সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। দলটির নির্বাচনী ইশতেহার থেকে শুরু করে ৩১ দফার সংস্কার রূপরেখা— সবখানেই লেখা ছিল একই কথা, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করা হবে, মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়ন করা হবে, আর সুপ্রিম কোর্টের অধীনে গড়ে তোলা হবে স্বাধীন সচিবালয়। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর যেন সেই প্রতিশ্রুতির ঠিক উল্টো পথেই হাঁটল সরকার।
সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিলের উদ্যোগ নেয় ক্ষমতাসীনরা। খুব বেশি সময় লাগেনি। আইন পাস হলো, অধ্যাদেশ বাতিল হলো। আর এর মাত্র ৪০ দিনের মাথায় সরকার সচিবালয় থেকে সব কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নিয়ে কার্যত পুরো কাঠামোটিকেই অচল করে দিয়েছে।
এ
সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রত্যাশা। আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, ‘কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের মাধ্যমে যে পদক্ষেপ তারা নিয়েছেন, তাতে তারা পেছনের দিকে
ঠেলে দিচ্ছেন।’ অথচ এই সচিবালয়ের জন্ম হয়েছিল দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে। ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে পৃথক সচিবালয় গঠনের নির্দেশ দেন। সেই রায়ের ভিত্তিতেই জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ৩০ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করে। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—
অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও শৃঙ্খলা যেন আইন মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে বিচার বিভাগের অধীনেই থাকে।
কয়েকদিন পর সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪-এ উদ্বোধন করা হয় নতুন সচিবালয়ের। সেখানে নিয়োগ পান ১৫ জন বিচারকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা। অনেকে তখন মনে করেছিলেন, বাংলাদেশে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতার পথে একটি বাস্তব পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর সংসদের বিশেষ কমিটি সুপারিশ করল— অধ্যাদেশটি বিল আকারে আর সংসদে না তোলাই ভালো। এরপর গত ৯ এপ্রিল সেটি রহিত করে আইন পাস হয়েছে। আর ১৯ মে রাতে জারি হওয়া দুটি গেজেট প্রজ্ঞাপনে সরকার জানিয়ে দিল— সচিবালয়ে কর্মরত ১৫ জন বিচারককে প্রত্যাহার করে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন ২০২৬’ চ্যালেঞ্জ করে এরই মধ্যে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেনসহ সাত আইনজীবী। তারা চেয়েছিলেন, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সচিবালয়ের কার্যক্রম যেন স্থগিত না করা হয়। এই রিটের পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, ‘রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন, যাতে সচিবালয় ধ্বংস না করা হয়। কিন্তু সরকার আদালতের সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা দেখায়নি। এ বিষয়ে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সচিবালয়ের কার্যক্রম বিলুপ্ত করায় আদালত অবমাননা হয়েছে।’
সরকারের সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট নিজেই। গতকাল বুধবার বিচারপতি আহমেদ সোহেলের বেঞ্চে যখন সচিবালয় বিলুপ্তির প্রজ্ঞাপন উপস্থাপন করা হয়, তখন আদালত রাষ্ট্রপক্ষকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন— ‘এটি কীভাবে সম্ভব?’
আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে প্রজ্ঞাপনের একটি বাক্য নিয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলছেন, এর অর্থ প্রধান বিচারপতির সম্মতি রয়েছে। কিন্তু তার প্রশ্ন, ‘হাইকোর্টের রায় তো স্থগিত হয়নি। তাহলে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কীভাবে এই প্রক্রিয়ায় সম্মতি দেওয়া হলো?’
যদিও সরকার বলছে, বিষয়টি পুরোপুরি শেষ হয়নি। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ১২ এপ্রিল জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যেগুলো সংসদে তোলা হয়নি, সেগুলো আরও যাচাই-বাছাই করে ভবিষ্যতে পুনরায় আনা হতে পারে।
বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল আগামীর সময়কে বলেছেন, সচিবালয় থেকে কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করা হলেও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বহাল থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা অধ্যাদেশটি অধিকতর যাচাই-বাছাই করে নতুন আইন পাস করা হবে। তারপর পৃথক সচিবালয় নতুন করে যাত্রা শুরু করবে। কিন্তু তাতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না অনেকে। এনসিপিপন্থী আইনজীবীরা সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন— এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংসের ‘নীলনকশা’। তারা বলেছেন, সরকার পরিকল্পিতভাবেই বিচার বিভাগকে আবার নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নিচ্ছে। আইনজীবী নেতা জহিরুল ইসলাম মুসা বলেছেন, ‘স্বাধীন এবং পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, বিএনপি সরকার সেখানে খুব বাজে হস্তক্ষেপ করেছে।’




