ফেসবুকে বিক্রি হচ্ছে মিড ডে মিলের বিস্কুট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লার্নিং সেন্টারের শিশু ছাড়াও রোহিঙ্গাদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে বিনামূল্যে দেওয়ার কথা বিশেষ ‘ফর্টিফায়েড বিস্কুট’। অথচ এই পুষ্টিকর খাবার এখন বেচাকেনা হচ্ছে ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে। যদিও পণ্যের গায়ে লেখা আছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সম্পদ, ক্রয়-বিক্রয় দণ্ডনীয় অপরাধ’ এবং ‘নট ফর সেল অর এক্সচেঞ্জ (বিক্রি অথবা পরিবর্তনের জন্য নয়)’।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএইচপি) অর্থায়নে আসা এই খাবার মার্কেটপ্লেসে দেখে চোখ কপালে অনেকের। খুচরা প্যাকেট নয়, রীতিমতো কার্টন ও বক্সে বেচাকেনা হচ্ছে এই সরকারি খাবার।
ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে ‘ফর্টিফায়েড বিস্কুট’ লিখে অনুসন্ধান করার সঙ্গে সঙ্গেই এই প্রতিবেদক দেখতে পায় ৬০টির বেশি বিজ্ঞাপন। এ ছাড়াও ‘রিসাইকেল বিন চিটাগং’ নামের ফেসবুক গ্রুপেও নিয়মিত বিক্রি হয় এই বিস্কুট। কেউ কিনলে তা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল— সবখানেই ছড়িয়ে এই চক্রের জাল। সবচেয়ে বেশি বিক্রি করা হচ্ছে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার থেকে। বাজারের সাধারণ বিস্কুটের চেয়ে পুষ্টিগুণে বেশি সমৃদ্ধ হওয়ায় এই বিস্কুটগুলো সাধারণ মানুষের কাছে লোভনীয় দামে বিক্রি করছে চক্রটি।
ঘটনার নেপথ্য জানতে ক্রেতা সেজে ফেসবুকে দুই বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। এক বিক্রেতা অকপটে স্বীকার করে বলছিলেন, তারা এগুলো সংগ্রহ করেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের থেকে। তারা বিভিন্ন এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে এই বিস্কুটগুলো পান; এরপর কম দামে বিক্রি করে দেন। এদিকে বিক্রেতারা তা ফেসবুকে সামান্য লাভ রেখে বিক্রি করছেন।
আরেক বিক্রেতার ভাষ্য, ‘আমি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে নিয়ে আসি।’ কোন ক্যাম্প থেকে আনেন জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেননি। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দেননি।
এদিকে এই কালোবাজারি শুধু সীমান্ত অঞ্চল বা রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই সীমাবদ্ধ নেই, এর একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে রাজধানী ঢাকা থেকে।
ঢাকাকেন্দ্রিক আরেক বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানাচ্ছিলেন, তারা বক্স আকারে পাইকারি বিক্রি করেন। তাদের কাছ থেকে নিতে হলে সর্বনিম্ন ১৯ প্যাকেট বিস্কুট কেনার শর্ত জুড়ে দেন। টাকা পরিশোধ করলে ঢাকার যেকোনো প্রান্তে হোম ডেলিভারি বা কুরিয়ারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তাও দেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফিডিং কর্মসূচির বরাদ্দ থেকেও একটি বড় অংশ চুরি হয়ে কালোবাজারে যাচ্ছে।
সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র শিশু এবং পুষ্টিহীনতায় ভোগা রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য আসা আন্তর্জাতিক সাহায্য এভাবে ফেসবুকে বিক্রি হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সমাজকর্মীরা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের দুর্বল নজরদারি এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুরু করে ঢাকার স্থানীয় কিছু অসাধু চক্রের কারণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির এই মানবিক উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. আফতাবুজ্জামান আল ইমরান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য বিস্কুট দেওয়া হয়। তারাই মূলত বাইরে বিক্রি করে দেয়।’
ক্যাম্প থেকেই অনেক ক্রেতা ফর্টিফায়েড বিস্কুট কিনে বিক্রি করছে জানালে তার ভাষ্য, ‘তথ্য পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে কীভাবে এই খাবার বাইরে আসছে এবং ঢাকার ভেতরের কোন কোন অসাধু চক্র এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’






