দীপু-মনীষ টানাপড়েনে পদ গেল মন্ত্রী দীপেনের!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ ইস্যুতে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবানসহ সারা দেশেই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। চলছে পদত্যাগের কারণ নিয়ে নানান ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। তবে সব আলোচনা ছাপিয়ে একটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে বেশ। সেটি হলো রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে পদত্যাগ করা পার্বত্য মন্ত্রীর মতানৈক্য!
ধারণা করা হচ্ছে, মন্ত্রী নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে সায় না পাওয়ায় হতাশ হন। এসব টানাপড়েনের কারণেই পদ ছাড়তে হয়েছে মন্ত্রীকে।
মন্ত্রীর পছন্দের প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির উপজাতিবিষয়ক সহসম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ান। যিনি সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের সমর্থনে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুকেই চূড়ান্ত করার নির্দেশনা ছিল।
নাম প্রকাশে অনাগ্রহী দীপন তালুকদার দীপুর ঘনিষ্ঠ একজন জানালেন, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সরাসরি রাঙামাটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের জন্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে দেওয়া হয় নির্দেশনা। বলা হয়, দলের জেলা সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুকে চেয়ারম্যান করে ফাইল পাঠাতে। সেই নির্দেশনা অমান্য করে মনীষ দেওয়ানকে চেয়ারম্যান রেখেই জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠান মন্ত্রী। আর এতেই বাধে বিপত্তি।
একইভাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মনীষ দেওয়ানের ঘনিষ্ঠ একজন বলছিলেন, ‘তার (মনীষ) সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দীপু তালুকদারসহ কয়েকজন উল্টাপাল্টা মিথ্যা কথা বলেছেন। যার কারণে তিনি বিরাগভাজন হয়েছেন মনীষের ওপর। সেই কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন তিনি।’
এদিকে মনীষ দেওয়ান বলেছেন, ‘শুরুতে আমি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আগ্রহী ছিলাম না। মন্ত্রী আমাকে প্রস্তাব করেছিলেন। আমি না করেছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পর বাস্তবিক কিছু কারণে আমি দলীয় একটি ফোরামে নেতাকর্মীদের সামনেই মন্ত্রীকে প্রকাশ্যেই চেয়ারম্যান হতে আগ্রহের কথা জানাই। তারপর থেকে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান আলোচনায় থাকা দুই প্রার্থী মানস মুকুর চাকমা ও সুভাষ চাকমাকে বাদ দিয়ে আমার জন্য ফাইল প্রসেসিং শুরু করেছিলেন বলে জানি। হঠাৎ শুনি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলালের মাধ্যমে নিজে চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। দলের নানা জায়গায় তদবিরও করেছেন।’
২০১১ সালে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ান। তিনি ১৯৭১ সালে পার্বত্য জেলায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারীও। নিজেকে এ পদের যোগ্য দাবি করে মনীষ দেওয়ান বলছিলেন, ‘বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারের ৫ আগস্টের আগে-পরের কার্যক্রম রাঙামাটি বিএনপির নেতাকর্মীরা জানে। আমি বলতে চাই না। সে আমাকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছে। তার বয়স আছে, সুযোগ আছে ভবিষ্যতে। কিন্তু সে আমাকে সুযোগই দিল না। সে আমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে গেল। এটা দুঃখজনক। তার আপন ভাই বর্তমানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। সেও একই পদে চেয়ারম্যান হবে, এটা কেমন কথা। এক পরিবার থেকে দুজন একই পদে চেয়ারম্যান হবে, বাকিরা তবে কোথায় যাবে?’
অন্যদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু বললেন, “আমি এমপি প্রার্থী ছিলাম। দল মনোনয়ন দেয়নি, তবু আমি দীপেন দেওয়ানকে জেতাতে সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু মন্ত্রী আমার কথা মনে রাখেননি। আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম, আমাকে সুযোগ দেন, আমি আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই। কিন্তু তিনি আমাকে সুযোগ দিলেন না। স্বাভাবিকভাবেই আমি আমার মতো করেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। দলের নীতিনির্ধারকরা আমাকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দিয়েছেন। আশা করি, আমি এ আস্থার প্রতিদান দিতে পারব।”
দীপন তালুকদার নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। জেলা বিএনপির সেক্রেটারি ছিলেন, বর্তমানে সভাপতি। প্রায় দুই যুগ বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় দীপন তালুকদারের প্রশ্ন, ‘আমি দলের সভাপতি। আমারও চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে। পাহাড়ে খুব বেশি পদ-পদবি নেই। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হতে পারলে আমি রাঙামাটির জন্য, দলের জন্য, নেতাকর্মীদের জন্য, রাঙামাটিবাসীর জন্য কাজ করতে পারব। এতে মন্ত্রীর হাতই শক্তিশালী হতো, তার ওপর চাপ কমত। এ জিনিসটাই আমি মন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি।’
তিনি জানালেন, প্রধানমন্ত্রীর যে মিশন-ভিশন, তা বাস্তবায়নে প্রতিটি জেলায় দলের সভাপতি-সম্পাদককে পদায়ন করা হয়েছে। সেই বিবেচনায় তিনি হয়তো সরকারের বিবেচনায় আছেন।
মনীষ দেওয়ানের সঙ্গে নিজের কোনো বিরোধ নেই দাবি করে দীপন তালুকদার বললেন, ‘তার সঙ্গে তো আমার সম্পর্ক ভালো। তার মনোনয়নের পক্ষে আমি অবস্থানও নিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি কেন আমার বিরুদ্ধে এখন অভিযোগ তুলছেন বা ফেসবুকে লিখছেন, আমি জানি না। কী কারণে এসব করছেন, আমি বুঝতে পারছি না। দল নিশ্চয়ই তাকেও মূল্যায়ন করবে এবং আরও ভালো কোনো জায়গায় বসাবে। আমার তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’
দীপন তালুকদার দীপুর আপন বড় ভাই কৃষিবিদ কাজল তালুকদার রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান। যিনি ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
এদিকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে বিরোধের জেরে পদত্যাগ করতে হয়েছে পার্বত্য মন্ত্রীকে, এমন বিশ্বাস রাঙামাটি বিএনপি নেতাকর্মীদের। তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। একে অন্যকে দুষছেন। বিভিন্ন নেতার অনুসারী নিজ নিজ নেতার সমর্থনে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন।




