ডিএমপির ব্রিফিং
যুবদল নেতা হাফিজুলকে ২৫ লাখে খুনের চুক্তি
- হত্যাচেষ্টার কারণ আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও দখল
- গ্রেপ্তার ৮, গোয়েন্দা জালে মূল পরিকল্পনাকারী

গ্রেপ্তার আসামিরা
কাফরুল যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার পরিকল্পনায় ভাড়াটে কিলারদের সঙ্গে ২৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিলো বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, জমিজমা দখলকে কেন্দ্র করেই মূলত করা হয় এই পরিকল্পনা।
আজ সোমবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম।
এদিকে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গোয়েন্দা পুলিশ ও কাফরুল থানা পুলিশ আট জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গ্রেপ্তাররা হলো- চঞ্চল, নাহিদ হাসান (২১), শাফিন আহমেদ (২২), মোঃ জিয়ারুল মোল্লা (৩৯), মোঃ আলী হোসেন (৪৫), মোঃ জিহাদ মোল্লা (৩০), মোঃ মাসুম বিল্লাহ (২৮) ও মোঃ আবির হাওলাদার (২৫)।
ব্রিফিংয়ে শফিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারদের চারজন ভাড়াটে শুটার।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, জমিজমা দখলকে কেন্দ্র করে হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিলো যুবদল নেতা বাবুর। আর এজন্যই বাবুকে হত্যা করতে পেশাদার খুনি ভাড়া করে হত্যার পরিকল্পনা করে সিএনজি হাফিজ।
তিনি আরও জানান, কিলাররা মিরপুরের একটি হোটেলে অবস্থান নিয়ে বাবুকে হত্যায় দুই দিনের চেষ্টা করে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। পরে শুক্রবার রাতে ফের হত্যার জন্য বাবুকে টার্গেট করা হয়। কিন্তু সেখানেও বাবুর অনুসারিদের সন্দেহের চোখে পড়ে খুনিরা। তাদের ধরতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ।
ডিবি প্রধান বলেছেন, কাফরুল থানার ওপেক্স গার্মেন্টসের দক্ষিণ পাশের লিংক রোডে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ নিহত হন। একই ঘটনায় সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মো. মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। হামলার পর পালানোর সময় স্থানীয় জনতা অস্ত্রধারী চঞ্চলকে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এ ঘটনায় নিহত ইউসুফের বড় ভাই মো. মাসুদ রানা বাদী হয়ে কাফরুল থানায় হত্যা মামলা করেন।
ডিবি জানায়, থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগ ছায়া তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে প্রথমে নাহিদ হাসান ও শাফিন আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জিয়ারুল, আলী হোসেন, জিহাদ মোল্লা ও মাসুম বিল্লাহকে বিভিন্ন জেলা থেকে গ্রেফতার করা হয়। অপরদিকে আবির হাওলাদারকে স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজের সঙ্গে থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। স্থানীয় ময়লার টেন্ডার, ফুটপাতের দোকান, ব্যবসা এবং একটি টিনশেড বাড়ির দখলকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সৃষ্টি হয়। এই বিরোধের জেরে হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাগুরা ও ঝিনাইদহ অঞ্চল থেকে প্রায় ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে পেশাদার খুনি ভাড়া করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, গত ২৯ জুন প্রথমবার হত্যাচেষ্টা চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু পিস্তলে গুলি লোড করার সময়ে অস্ত্রে মিসফায়ার হয়। পরবর্তী ওই দিন হত্যার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পরে ২২ জুলাই পুনরায় ঢাকায় এসে অভিযুক্তরা মিরপুর-২ এলাকার একটি হোটেলে অবস্থান নেয় এবং ২৩ জুলাই রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলার জন্য প্রস্তুতি নেয়।
ডিবির দাবি, ঘটনার রাতে হাফিজুল ইসলাম বাবুর অফিসের সামনে অবস্থান নেওয়া সন্দেহভাজনদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের মিরপুর-১০ এলাকার বাসিন্দা বলে পরিচয় দেয়। পরে তাদের দেহ তল্লাশির চেষ্টা করা হলে একজন অস্ত্র বের করে যুবদল কর্মী ইউসুফের বুকে গুলি করে। এই সময়ে দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মনির হোসেন আহত হন।
হত্যাকাণ্ডে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো নির্দিষ্ট দল নেই এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে তাদের সন্ত্রাসী হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ২৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। যার পেছনে মূলত এলাকার ময়লা নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল এবং ফুটপাত দখলের মতো বিষয়গুলো জড়িত ছিল। গ্রেপ্তাররা জানিয়েছে যে, সিএনজি হাফিজ তাদের ভাড়া করে নিয়ে এসেছিল।
অস্ত্রের উৎস এবং মিরপুরে হিজড়াদের দুটি গ্রুপের মহড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সব সময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটার পূর্বেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় অপরাধীরা ‘আব্বাস’ বা ‘ইব্রাহিম’ এর মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে ‘ব্র্যান্ডিং’ করার চেষ্টা করে, তবে বর্তমানে তাদের সরাসরি কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকায় ঘটা ৩০ থেকে ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা দেখা যাচ্ছে বলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করছে না। ভিকটিম এবং টার্গেট উভয় পক্ষেরই রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে যে, আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে। হাফিজ বর্তমানে এই পরিকল্পনার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। চুক্তির ২৫ লাখ টাকার মধ্যে প্রাথমিকভাবে কিছু টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল এবং হোটেল ভাড়া ও খাওয়ার খরচ বহন করা হয়েছিল। পুলিশ একটি অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে এবং অন্যগুলোর উৎস সন্ধানে কাজ করছে।
অস্ত্রের ডিলার হিসেবে বিদেশে অবস্থানরত ইব্রাহিম বা আব্বাসের নাম আসার প্রসঙ্গে পুলিশ জানায়, যে অস্ত্র বহন করছে বা ব্যবহার করছে তাকেই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে এবং এখানে তথ্য গোপন করার কোনো সুযোগ নেই।
ডিবি জানায়, এ ঘটনায় কাফরুল থানায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। হত্যা মামলাটি বর্তমানে ডিবির তদন্তাধীন রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম চলমান এবং মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।





