এক কোটি কর্মসংস্থানের ছক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, এক দশক ধরে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক বলছে, এই সংখ্যা ৫৩ লাখ বা তার বেশি। আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা বিবেচনায় নিলে সংখ্যাটি ছাড়িয়ে যাবে কোটির ঘর। বিষয়টি ছিল ক্ষমতাসীন দলবিএনপির চিন্তায়ও। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও গুরুত্ব পেয়েছিল বিষয়টি। ক্ষমতায় থাকাকালে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান করার আশ্বাস ছিল তাতে। এখন সরকার গঠনের পর নিয়েছে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ। আগামী আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত পরিকল্পনা উদ্বোধনের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। তাতেই মিলবে প্রায় কোটি কর্মসংস্থানের রোডম্যাপ।
পরিকল্পনাটি তৈরি করছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। জিইডি সূত্র বলছে, ছয় ধাপে তৈরি করা হবে ৯৩ লাখ ২৭ হাজার কর্মসংস্থান। এর মধ্যে দেশে তৈরি হবে ৭৮ লাখ ৮৭ হাজার এবং বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে কর্মসংস্থান করা হবে ১৪ লাখ ৪০ হাজার। সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সেবা খাতে এবং সবচেয়ে কম শিল্পে।
জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন আগামীর সময়কে জানালেন, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি সঙ্গে মিল থেকে তৈরি করা হয়েছে সম্ভাব্য এই কর্মসংস্থানের রোডম্যাপ। অবশ্য রোডম্যাপটি এখনো চূড়ান্ত নয় উল্লেখ করে তিনি বললেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক অন্যান্য ফ্যাক্টরের উন্নতি ঘটাতে হবে।
তার দাবি, যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এটির সফল বাস্তবায়ন হলে কমবেশি ১ কোটি কর্মসংস্থান হবে। এ কারণে সমান সমান ১ কোটির হিসাব মেলানো হয়নি।
সূত্র জানায়, ২০২৬-৩১ সালের মধ্যে এসব নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এর মধ্যে ২০২৬ সালে দেশে তৈরি কর্মসংস্থান হবে ৬৯ লাখ ৯ হাজার এবং বিদেশে ১১ লাখ ২০ হাজার। ২০২৭ সালে গিয়ে দেশে বেড়ে ৭০ লাখ ৬৬ হাজার এবং বিদেশে হবে ১১ লাখ ৮০ হাজার। ২০২৮ সালে আরও বেড়ে দেশে কর্মসংস্থান ৭২ লাখ ৩৯ হাজার এবং বিদেশে হবে ১২ লাখ ৪০ হাজার। এ ছাড়া, ২০২৯ সালে দেশে ৭৪ লাখ ২৯ হাজার এবং বিদেশে হবে ১৩ লাখ। ২০৩০ সালে গিয়ে দেশে কর্মসংস্থান বেড়ে ৭৬ লাখ ৫৩ হাজার এবং বিদেশে হবে ১৩ লাখ ৭০ হাজার। পরিকল্পনা শেষে ২০৩১ সালে গিয়ে মোট দেশীয় কর্মসংস্থান বেড়ে দাঁড়াবে ৭৮ লাখ ৮৭ হাজার এবং বিদেশে হবে ১৪ লাখ ৪০ হাজারজনের।
এদিকে, খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে রোডম্যাপে। এর মধ্যে ২০৩১ সালে গিয়ে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে সেবা খাতে ৩২ লাখ ১১ হাজার। কর্মসংস্থান সৃষ্টির দ্বিতীয় উৎস হিসেবে ধরা হয়েছে কৃষি খাত। এ খাতে কর্মসংস্থান হবে ৩১ লাখ ৪৪ হাজার। শিল্প খাত রয়েছে তৃতীয় উৎস হিসেবে। এ খাতে কর্মসংস্থান হবে ১৫ লাখ ৩২ হাজার। শিল্প খাতের মধ্যে আবার ভাগ করে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে ২০৩১ সালে নতুন কর্মসংস্থান হবে ১০ লাখ ২৮ হাজার এবং নির্মাণ ও অন্যান্য মিলে হবে ৫ লাখ ৪ হাজার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, কর্মসংস্থান মানেই যে চাকরি তৈরি করতে হবে, ব্যাপারটি সেকরম নয়। ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে যেটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কেননা এখানে অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। এ ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত অনেক বেশি শ্রমঘন হওয়ায় এখানেও নজর দিতে হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
সালেহউদ্দিনের ভাষ্য, ‘কোরিয়ার মতো উন্নয়ন দেশগুলোয় বেশিরভাগ মানুষই ব্যবসা করেন। সেখানে চাকরির দিকে আগ্রহ থাকে না। আমাদেরও স্টার্টআপের মতো উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। সেই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নত করতে হবে। কেননা মানুষ গ্রাম থেকে যেভাবে শহরে পাড়ি জমায়, এটি কাম্য নয়। গ্রামেই যদি আয়ের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে শহরের ওপর চাপ কমবে।
পরিকল্পনার খসড়ায় বলা হয়েছে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হতে হলে সেই অনুপাতে মোট দেশ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও জরুরি। এজন্য পরিকল্পনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ২ শতাংশ হলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সেটি বেড়ে দাঁড়াবে সাড়ে ৬ শতাংশে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে হবে ৭ শতাংশ। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে দাঁড়াবে সাড়ে ৭ শতাংশে। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৮ শতাংশ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে গিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও হার দাঁড়াবে সাড়ে ৮ শতাংশ।






